এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনেই বিষণ্ণতায় ডুবে প্রাণ হারালো তিন শিক্ষার্থী। সোমবার দুপুরে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চাঁদপুর — এই তিন জেলায় আলাদা তিনটি ঘটনায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার খবর সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তারা। হাসপাতালে নেওয়ার পথে বা সেখানে পৌঁছানোর আগেই সবার মৃত্যু হয়।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় এক ছাত্রী পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ায় মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দেওয়া ওই ছাত্রী জানতে পারে, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন — এই দুই বিষয়ে সে অকৃতকার্য হয়েছে। খবরটি জানার পরই সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। বেলা দেড়টার দিকে সে নিজ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘরের দরজা খুলে দেখতে পান, ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলছে সে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়।

ওই ছাত্রীর বাবা কাঞ্চন কুমার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, মেয়েটি অত্যন্ত ভালো ছাত্রী ছিল। কষ্ট করে লেখাপড়া করানো হচ্ছিল। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার জানান, এবার বিদ্যালয়ের ফলাফল মোটেও ভালো হয়নি। ৩২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৬ জন পাস করেছে। আত্মহত্যাকারী ছাত্রীটি ছিল মেধাবী, তার ফল খারাপ হওয়ার কারণ তিনি ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে এবং একটি অপমৃত্যু মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় একই দিনে দুপুরে ফল প্রকাশের পরই বিষপান করে আত্মহত্যা করে আরেক ছাত্রী। উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল সে। ফলাফলে দেখা যায়, বাকি সব বিষয়ে পাস করলেও ইংরেজিতে সে অকৃতকার্য হয়েছে। এই ব্যর্থতা মেনে নিতে না পেরে পরিবারের সবার অজান্তে সে বিষ পান করে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বেলা ২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। শিবগঞ্জ থানার ওসি মতিউর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায়ও ফল প্রকাশের খবর শুনেই মৃত্যু হয় এক মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীর। দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার খবর পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। দুপুর ১২টার দিকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার চাচা ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনার সময় বাড়িতে কেউ ছিল না। ফল পাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। শাহরাস্তি থানার ওসি মীর মাহবুবুর রহমান জানান, ফল শোনার পর মাথা ঘুরে পড়ে যায় তার। হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়। পুলিশ ঘটনাটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখছে।

এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক শফিউল আজম মন্তব্য করেছেন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে জীবন শেষ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় নানা ত্রুটি রয়েছে এবং এই ত্রুটিগুলোর বলি হচ্ছেন অল্প বয়সের আবেগপ্রবণ শিক্ষার্থীরা। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সমাজেরও দায় আছে।