কর্মবাজারে নতুন স্নাতকদের জন্য সুযোগ এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবেশপদের নিয়োগ কমেছে, প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন অনেক কাজ নিজের দখলে নিচ্ছে যা আগে সদ্য পাশ করা তরুণদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এর ফলে লক্ষ লক্ষ তরুণ বেকারত্বের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি শুধু মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-আয়ের পরিবারকেই নয়, আমেরিকার অতি-ধনী পরিবারগুলোকেও একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—তাদের সন্তানরা কি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে এবং নিজেদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হবে?
এই বাস্তবতায় বিলিয়নিয়াররাও এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আসেন্ট প্রাইভেট ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টম থিগস ফর্চুনকে বলেছেন, ধনীদের কাছে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সন্তানদের সফলতার জন্য কী প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মিলিয়নিয়ার ও বিলিয়নিয়াররা বুঝতে শুরু করেছেন, এটি আর তাঁদের নিজেদের খেলার নিয়ম নয়—এই মন্তব্য করেছেন আলাইনড বাই নিউএজ ওয়েলথের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্যাট্রিক ডুয়ার, যিনি প্রায় ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটির বেশি ডলারের সম্পদধারী গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করেন। ডুয়ার আরও বলেছেন, তাঁদের গ্রাহকরা চিন্তিত যে ২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সন্তানরা প্রযুক্তি, আইন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় চাকরি পেতে ও টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ৩৩ বছর বয়সে যদি কোনো সন্তানকে নতুন করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়, তাহলে কী হবে? এই অবস্থার কারণে ধনী পরিবারগুলোকে ভবিষ্যতে সন্তানদের কাছে আরও বেশি সম্পদ হস্তান্তরের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। ডুয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, যদি সন্তানরা নিজেরাই সম্পদ সঞ্চয় করতে না পারে, তাহলে তাদের জীবনযাপনে এজেন্সি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাবা-মায়ের চেয়ে কমে যেতে পারে।
থিগসের মতে, এই উদ্বেগ আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক মনে হতে পারে। কেন একজন বিলিয়নিয়ার সন্তানের চাকরি নিয়ে চিন্তিত হবেন? কিন্তু বাস্তবে, টাকা যতই থাকুক না কেন, প্রতিটি অভিভাবকই চান তাঁদের সন্তান সফল হোক এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করুক। এটি একটি বাস্তব উদ্বেগ, যা তিনি বর্তমানে অতি-ধনী পরিবারগুলোর কাছ থেকে শুনছেন। তাঁর মতে, সমস্যা শুধু আর্থিক নিরাপত্তা নয়; কর্মবাজারের অস্থিরতা কীভাবে সন্তানের উদ্দেশ্যবোধ, পরিচয় ও আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করবে, সেটিই বড় চিন্তার বিষয়। পাশাপাশি, প্রচুর সম্পদ সন্তানদের কাজের প্রতি ড্রাইভ বা ইচ্ছাশক্তিকে ম্লান করে দিতে পারে বলেও অভিভাবকরা আশঙ্কা করছেন।
এই কারণে শুধু একটি আর্থিক নিরাপত্তা জাল তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। থিগস পরামর্শ দেন, সন্তানদের বৃদ্ধি ও বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এস্টেট পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা এখন অত্যাবশ্যক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু নিট সম্পদ নয়, আত্মমূল্যকে সমর্থন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিডার পয়েন্ট ক্যাপিটাল পার্টনার্সের পরিকল্পনাবিদ ট্রেন্ট ভন আহসেনও মনে করেন, এই শ্রেণির অভিভাবকরা সন্তানদের কম সহায়তা করার চেয়ে বেশি সহায়তা করার ঝুঁকি নিয়ে বেশি চিন্তিত। তাঁর ভাষ্যমতে, তারা সন্তানদের চিরস্থায়ীভাবে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলার ভয় পাচ্ছেন—অর্থাৎ, অতি-সহায়তা সন্তানদের স্বাধীন হতে বাধা দিচ্ছে।
এই নতুন বাস্তবতায় জেন জি প্রজন্মও নিজেরাই কর্মপথ বদলাচ্ছে। অফিসভিত্তিক বা পেশাদারি খাতে ব্যাপক ছাঁটাই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয়ে অনেক তরুণ ঐতিহ্যবাহী কর্পোরেট পথ ছেড়ে অন্য দিকে ঝুঁকছেন। কেউ সৃষ্টিশীল পেশায় যাচ্ছেন, কেউ উৎপাদন, বৈদ্যুতিক কাজ বা অন্যান্য কারিগরি পেশার মতো শ্রমভিত্তিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে কলেজ-শিক্ষিত তরুণরা অভিজাত পরিবারে ছয় অঙ্কের বেতনের শিশুপালক ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করছেন, যা ঐতিহ্যবাহী অফিস ক্যারিয়ারের বাইরে আর্থিক স্বাধীনতার পথ খুঁজে বের করার একটি উদাহরণ। ২০২৫ সালের ডেলয়েটের একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৬ শতাংশ জেন জি উত্তরদাতা কর্পোরেট নেতৃত্বে পৌঁছানোকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখেন। পরিবর্তে বেশিরভাগই কর্ম-জীবনের ভারসাম্য, ব্যক্তিগত পরিপূর্ণতা এবং শেখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ফলে ধনী পরিবারগুলোকে এখন নতুনভাবে আর্থিক পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে। ভন আহসেন জানান, এখন এককালীন বড় উত্তরাধিকারের পরিবর্তে শিক্ষা তহবিলের নমনীয়তা, পরামর্শদান এবং ধাপে ধাপে সম্পদ হস্তান্তরের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো, সন্তানদের উদ্যোগ কেড়ে নেওয়া ছাড়া তাদের সুযোগ প্রদান করা—অর্থাৎ, দায়িত্ব ও বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতার একটি ভারসাম্য তৈরি করা। থিগসের মতে, এটি একটি মনোভাবগত পরিবর্তন, যেখানে শুধু সম্পদ নয়, সুযোগের মাধ্যমে সন্তানদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা হবে।




