স্পেনের লা লাগুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল সম্প্রতি ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিওলজি’ সাময়িকীতে একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রকাশ করেছে। সেখানে মিসরের লাক্সর শহরের নিকটবর্তী থিবান নেক্রোপলিসের একটি নির্দিষ্ট সমাধিকক্ষ থেকে পাওয়া প্রাচীন মমিগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এই নেক্রোপলিসটি চার শতাধিক সমাধির সমন্বয়ে গঠিত একটি বিস্তৃত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা।
গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘টিটি ২০৯’ নামের একটি সমাধি, যা ৭৫৪ থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক সময়কালটি নুবিয়ান বা কুশীয় সাম্রাজ্যের ২৫তম রাজবংশ হিসেবে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই একটি ঘরের ভেতরেই অন্তত ২০ জন মানুষের পাশাপাশি একটি কুকুরের মমি করা দেহাবশেষ সংরক্ষিত ছিল। মোট নয়টি ভিন্ন ধরনের সমাধিস্থলের অস্তিত্ব সেখানে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যারেড কারবালো-পেরেজ জানান, দেহগুলো কোনোভাবে এলোমেলোভাবে নিক্ষিপ্ত স্তূপ ছিল না। বরং প্রতিটি মমির অবস্থানই ছিল সুপরিকল্পিত। পুরোনো সময়ের মমিগুলোর প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের দেহগুলো সেখানে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রাখা হতো। এই বিন্যাস স্পষ্ট করে যে, ঘরটি কেবল একটি সংরক্ষণাগার নয়, বরং পূর্বপুরুষদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার এক বিশেষ স্থান।
গবেষণার সহলেখক মিগেল অ্যাঞ্জেল মলিনেরো পোলো ব্যাখ্যা করেন, প্রথম পর্যায়ে যাঁদের এখানে সমাহিত করা হয়েছিল, তাঁরা ছিলেন সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তি। তাঁদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ কাঠের কফিন ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল্যবান সামগ্রী। একটি বিশেষ দৃশ্যে দেখা যায়, একটি মমি করা কুকুরকে সরাসরি এক পুরুষ ও এক নারীর মমির ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। কারবালো-পেরেজের ভাষায়, “বিষয়টি বেশ চমৎকার। এতে মানুষের সঙ্গে প্রাণীটির গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক স্পষ্ট হয়, যা আমরা সহজেই অনুভব করতে পারি।”
সময়ের ধারাবাহিকতায়, বিশেষ করে ২৫তম রাজবংশের শেষের দিকে (৬৮০ থেকে ৪০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ), যা ইতিহাসে পারস্য যুগ নামে পরিচিত, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিয়মে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, ঘরের ভেতরে যেখানে ফাঁকা জায়গা ছিল, সেখানেই নতুন মমি রাখা হতো। এই কারণে টিটি ২০৯-এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেহই খাড়াভাবে সাজানো অবস্থায় পাওয়া যায়। অনেক সময় মমির হাত ও পায়ের অবস্থান বদলে সাজাতে হয়েছে। আলাদা করে নতুন সমাধি খননের পরিবর্তে এই ঘরের ভেতরেই স্থান ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা হ্রাস পেয়েছিল। পরবর্তী যুগের অনেক মমির ক্ষেত্রেও বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে রাখার প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কাঠের কফিনের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দেহগুলোকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে মমি করা হয়েছিল। পাশাপাশি কিছু খাড়া মাটির কলস পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় তখনকার সময়ে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম পালন করা হতো।
আগের ধারণা ছিল যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত সমাধিস্থলগুলো ক্রমশ মৃতদেহে ভরে গিয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু টিটি ২০৯-এর প্রমাণ অন্য কথা বলে। ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই ঘরে স্বজনদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে শ্রদ্ধা ও যত্নের কোনো অভাব ছিল না। গবেষকরা প্রতিটি মমির ছবি তুলেছেন, তাদের নকশা অঙ্কন করেছেন এবং সাজানোর বিস্তারিত বিবরণ নথিভুক্ত করেছেন। এই সব তথ্য পপুলার সায়েন্সের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।




