প্রতি বছরের মতো আজ ২৮ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো এই দিবসটি উদযাপন করে থাকে, যার মূল লক্ষ্য হেপাটাইটিস সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং এর প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাপী গর্ভবতী নারীদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ দেখা যায়। কোনো অন্তঃসত্ত্বা মা যদি হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হন, তবে তার গর্ভস্থ শিশুরও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বিশেষ করে প্রসবের সময় নবজাতকের সংক্রমণের আশঙ্কা অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদে এই ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুরা লিভার সিরোসিসসহ নানা জটিল লিভার রোগে ভুগতে পারে। তবে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে বেশিরভাগ নবজাতককে এই সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি পজিটিভ গর্ভবতী মায়ের আগে থেকেই দুটি রক্ত পরীক্ষা—এইচবিভি ডিএনএ এবং এইচবিইএজি—করা জরুরি। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসের মাত্রা বা তীব্রতা বোঝা যায়। ফল পজিটিভ এলে গর্ভাবস্থার ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ সেবন শুরু করতে হবে। এর ফলে মায়ের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ ও তীব্রতা কমে যায়, যা নবজাতকের সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করে। শিশু জন্মের পর সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ (জন্ম ডোজ) এবং হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিন দুটি ভিন্ন ঊরুতে দেওয়া আবশ্যক। এই দুই ডোজের সমন্বয় শিশুকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদান করে।
জন্মের পর প্রথম ডোজ দেওয়ার পর জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী পেনটা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে শিশুর বাকি ডোজগুলো (দেড় মাস, আড়াই মাস ও সাড়ে তিন মাস বয়সে) সম্পন্ন করতে হবে। জন্মের সময় দেওয়া ডোজের কারণে পরবর্তী ডোজগুলো বাদ দেওয়া যাবে না। টিকাদান শেষে শিশুর শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন গড়ে উঠেছে তা যাচাই করতে ৯ থেকে ১২ মাস বয়সে বা পেনটা ভ্যাকসিনের শেষ ডোজের অন্তত ১-২ মাস পর এইচবিএসএজি ও অ্যান্টি-এইচবিএস পরীক্ষা করা যেতে পারে।
মায়ের হেপাটাইটিস বি ধরা পড়লে পরিবারের বাবা ও অন্যান্য ঘনিষ্ঠ সদস্যদেরও এইচবিএসএজি পরীক্ষা করানো উচিত। যাদের সংক্রমণ নেই এবং আগে টিকা নেননি, তাদের পূর্ণ ডোজে হেপাটাইটিস বি টিকা গ্রহণ করা জরুরি। শিশুর এই রোগ অনেক সময় জন্ডিস বলে ভুল করেন অনেকে। বি পজিটিভ মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন কি না—এ নিয়ে মা ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বিধা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মের সময় শিশুকে হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিন ও ভ্যাকসিন দেওয়া থাকলে মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মায়ের এইচবিএসএজি পরীক্ষা করানো উচিত। পজিটিভ এলে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা করে ভাইরাসের অবস্থা বুঝতে হবে। ভাইরাল লোড বেশি হলে গর্ভাবস্থায় চিকিৎসা শুরু করা উচিত। জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিন ও ভ্যাকসিন দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পেনটা ভ্যাকসিনের সব ডোজ সম্পন্ন করা এবং পরে পরীক্ষা করে সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। জন্ডিস থেকে যে কোনো সময় লিভার ফেইলিওর হতে পারে বলেও সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা।




