একটি মধুর সংসার গড়তে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ এবং প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয় অপরিসীম। নিজের অভিমান ও রাগকে সংযত করে একজন স্বামীকে হয়ে উঠতে হয় কৌশলী ও স্নেহশীল। দাম্পত্য জীবনে বোঝাপড়ার অভাব সম্পর্কে দুর্বলতা তৈরি করে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। অথচ কিছু মৌলিক অভ্যাসের চর্চাই ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। স্ত্রীর ভুল অপমান নয়, আন্তরিক স্নেহ দিয়ে সংশোধন করা উচিত এবং তাকে বোঝানো প্রয়োজন যে তিনিই তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষার আলোকে প্রথম কৌশলটি হলো নিজের ও স্ত্রীর প্রতি যত্ন নেওয়া। ঘরের পরিবেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমন পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমনটি আমি তার কাছ থেকে চাই।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩) এটি আসলে শ্রদ্ধা জানানোর একটি সুন্দর প্রকাশ। এছাড়া সামর্থ্যানুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এই যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝে মাঝে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর তাতে কৃপণতা না করাই শ্রেয়। এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) বলেছেন, সওয়াবের আশায় পরিবারের জন্য ব্যয় করা সদকাস্বরূপ। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১) তেমনি, ঘরের কাজে সহায়তা করা এবং ছোট ছোট ভালো কাজের আন্তরিক প্রশংসা করাও একই সুতায় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯) খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরও নিজের সামনে এ প্রশংসা অব্যাহত ছিল। প্রশংসা কখনো আগের সম্পর্ককে ছোট করে না, বরং তা ভালোবাসা বাড়ায়।
দ্বিতীয় কৌশলটি হলো স্ত্রীর সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা। দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য হতেই পারে, প্রয়োজনে কিছু সময় দূরত্ব বা বিছানা আলাদা রাখা যেতে পারে, কিন্তু শারীরিক আঘাত একেবারেই অনুচিত। নবীজি (স.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে ক্রীতদাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪) এই নিষেধাজ্ঞাটি এতটাই সুস্পষ্ট যে এর কোনও ব্যাখ্যা প্রয়োজন পড়ে না। সম্মান বজায় রাখতে করো নামে না ডাকা, অশালীন শব্দ ব্যবহার, এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে কটূক্তি পুরোপুরি পরিত্যজ্য। যৌতুকের দাবিও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্ত্রীর অপরের সঙ্গে তুলনা করাও অসম্মানী জনক; তার ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে অন্তরালে সংশোধনের পথই সঠিক। পতনের পুরোনো ভুলে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়াও এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। ক্ষমার মানসিকতা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই একটি সুস্থ সম্পর্কের পরিচায়ক।
সময় দেওয়ার বিষয়টি তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। দাম্পত্যে খেলার ও রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানোকে অনেকে তুচ্ছ ভাবেন, কিন্তু নবীজি (সা.)-এর জীবনেই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক সফরে নবীজি তার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার জিতেন আয়েশা। পরে, যখন আয়েশার শরীর ভারী হয়, দ্বিতীয় প্রতিযোগিতায় নবীজি (সা.) জিতে গিয়ে হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের প্রতিশোধ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮) এই ঘটনাই প্রমাণ করে স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলা নবীজির অভ্যাসের অংশ ছিল। এ ব্যাপারে নবীজি (সা.) একটি মূলনীতিও বলেছেন, মানুষের বেশিরভাগ খেলা-ধুলা অনর্থক, কিন্তু তিনটি ব্যাতিক্রম, এর মধ্যে একটি হলো ‘স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭) অতএব, স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা, একত্রে আহার, ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদিকে বিলাসিতা নয় বরং সুন্নতের একটি অংশ বলে গ্রহণ করা যায়।
সবশেষে চতুর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলটি হলো রাগের মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ। এটিই আগের সব অভ্যাসের বাস্তব পরীক্ষা। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞা বদলে দিয়ে বলেন, ‘প্রকৃত বীর সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়, বরং সেই শক্তিশালী যে রাগের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪) দাম্পত্য জীবনের সকল বিবাদে এই নীতিটি সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। রাগের বশে তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারাজীবনের পশ্চাৎপদ সৃষ্টি করে, অথচ মুহুর্তের ধৈর্যই হলো প্রকৃত বীরত্ব।
মোটকথা, সুখী দাম্পত্যের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমা ও আল্লাহভীতি। অভিমান, রাগ, অহংকার এবং অহেতুক বিতর্ক থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুন-দুঃখের প্রকৃত সঙ্গী হওয়ার নামই সুন্দর সংসার। এটি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।




