মহান আল্লাহ সময়কে তাঁর অসংখ্য নিদর্শনের একটি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। দিন-রাত, মাস ও বছর—সবকিছুই তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো সময় নিজস্বভাবে কল্যাণকর বা অকল্যাণকর নয়; বরং আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী যেকোনো সময়কে বরকতময় করতে পারেন এবং মানুষকে পরীক্ষা করতে পারেন। জাহেলি যুগের আরব সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে সফর মাস দুর্ভাগ্য ও অকল্যাণের মাস। ইসলামের আবির্ভাবের পর মহানবী (সা.) এসব ভিত্তিহীন বিশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে মানুষকে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার নির্দেশ দেন।
হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস হলো সফর। মহররমের পরেই এর অবস্থান। ইসলামের ইতিহাসে অন্যান্য মাসের মতো এ মাসেরও কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে সফর মাসে অশুভ বলতে কিছু নেই, আবার বিশেষ কোনো ফজিলতও প্রমাণিত নয় কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা। জাহেলি যুগের মানুষেরা বিভিন্ন সময় ও ঘটনাকে নিজেদের ধারণা অনুযায়ী শুভ-অশুভ ভাগ করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, সফর মাসে বিপদ-আপদ বেড়ে যায়, ব্যবসায় ক্ষতি হয়, বিয়েশাদি করলে অকল্যাণ হয় এবং ভ্রমণে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। এ মাসে তারা নতুন কোনো কাজ শুরু করত না।
ইসলাম মানুষের এসব ভুল ধারণা দূর করে দিয়েছে। কেননা একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, সৃষ্টির কোনো কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া মানুষের ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছাবে না, তবে তা-ই যা আল্লাহ আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহর ওপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৫১) রাসুল (সা.) বলেন, ‘সংক্রমণ, অশুভ লক্ষণ, প্যাঁচা এবং সফর মাসের অশুভতার কোনো বাস্তবতা নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৫৭) এই হাদিসে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে সফর মাসকে ঘিরে প্রচলিত অশুভ ধারণার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই।
ইসলাম মানুষকে আল্লাহনির্ভর জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। কুসংস্কার মানুষের অন্তরে অমূলক ভয় সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে আল্লাহর ওপর ভরসার পরিবর্তে সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। যে সমাজ কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়, তারা প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে ভাগ্য বা অলৌকিক শক্তিকে দায়ী করে। ফলে তারা বাস্তব করণীয় থেকে দূরে সরে যায়। রাসুল (সা.) কুসংস্কারকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, ‘কুসংস্কার হচ্ছে শিরক।’ এর প্রতিকারে তিনি তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৯১০) এভাবে ইসলাম কুসংস্কারের বিপরীতে একটি ইতিবাচক ও কার্যকর সমাধান উপস্থাপন করেছে; শুধু নিষেধ করেই থেমে থাকেনি।
মুমিন বিশ্বাস করে যে জীবনের প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীন। কখনো বিপদ আসে পরীক্ষা হিসেবে, কখনো পাপমোচনের উপায় হিসেবে, আবার কখনো বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫) তাই বিপদ এলে মুমিনের করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, কোনো মাস বা সময়কে দোষারোপ করা নয়।
ইসলামে সফর মাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ইবাদত, নামাজ, রোজা বা দোয়ার বিধান নেই। কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো আমলের কথা বর্ণিত হয়নি, যা কেবল সফর মাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এ মাসে বিশেষ ফজিলতের নিয়তে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত নামাজ আদায়, বিশেষ দোয়া পাঠ, শেষ বুধবার (আখেরি চাহার সোম্বা) উপলক্ষে বিশেষ ইবাদত পালন কিংবা নির্দিষ্ট সদকা করার মতো আমলের কোনো শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই। তবে বছরের অন্যান্য মাসের মতো এ মাসেও সব ধরনের ইবাদত যথারীতি পালন করা উচিত। ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই ধর্মে এমন কোনো নতুন বিষয় সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭) তাই সফর মাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে এমন কোনো বিশেষ ইবাদত বা ফজিলত নির্ধারণ করা যাবে না, যার প্রমাণ কোরআন ও সুন্নাহতে নেই।




