একজন মুমিনের কাছে সময়ের মূল্য শুধু জাগতিক উন্নতির সোপান নয়, বরং তা সরাসরি আখিরাতের জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম খেয়ে মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সময় ব্যবস্থাপনা মানে দৈনন্দিন কাজগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে কম সময়ে বেশি ফলপ্রসূ হওয়ার একটি দক্ষতা। এখানে এমন তিনটি অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করা হলো, যা মুমিনের সময়কে আরো অর্থবহ করে তুলতে পারে।

প্রথমত, অবসর সময়কে কাজে লাগানোর গুরুত্ব অপরিসীম। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'এমন দুটি নেয়ামত রয়েছে, যার ব্যাপারে বহু মানুষ ধোঁকায় থাকে—সুস্থতা ও অবসর সময়।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২) এই হাদিসের শিক্ষা হলো, সুস্বাস্থ্য ও অবকাশ দুটোই অস্থায়ী। কখন এগুলো শেষ হয়ে যাবে তা কেউ জানে না। তাই যানজটে আটকে থাকা, লাইনে দাঁড়ানো বা কারও অপেক্ষার মতো ক্ষণিক সময়কেও ফেলে না দেওয়া উচিত। ছোট একটি নোটবুক সঙ্গে রাখা, কোনো বই পড়া অথবা জিকিরে মশগুল থাকার মাধ্যমে এই সময়গুলোকে কাজে লাগানো সম্ভব। শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়াও এই নীতির অন্তর্ভুক্ত। ক্লান্ত বা অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো পরিকল্পনাই কার্যকর হয় না। তাই পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, সময়মতো ঘুম ও কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি নেওয়া বিলাসিতা নয়, বরং সময়কে দীর্ঘমেয়াদে সদ্ব্যবহারের পূর্বশর্ত।

দ্বিতীয়ত, নিজের জন্য প্রযোজ্য নয় এমন দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। সামাজিক লৌকিকতা বা দ্বিধার কারণে আমরা প্রায়ই এমন সব কাজ কাঁধে নিয়ে নিই, যা আমাদের সময়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ব্যাপারে একটি মূলনীতি প্রদান করেছেন, 'একজন মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ হলো, যা তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তা থেকে দূরে থাকা।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৮) হাদিসটি অহেতুক কথাবার্তা ও কাজ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিলেও এর নীতিটি সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিজের সঙ্গে সম্পর্কহীন বা অপ্রয়োজনীয় কাজে বিনয়ের সঙ্গে কিন্তু দৃঢ়ভাবে 'না' বলতে শেখা সময় রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

তৃতীয়ত, সাধ্যের বাইরে না গিয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অনেক সময় আমরা নিজের সামর্থ্যের অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা করে ফেলি, যা পূরণ না হলে হতাশা ডেকে আনে। নবীজি (সা.) এখানেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, 'যতটুকু সাধ্য, ততটুকু আমল করো। কারণ, সর্বোত্তম আমল সেটাই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।' (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৪০) এই নীতি শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের যেকোনো কাজের পরিকল্পনার জন্যই প্রযোজ্য। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য স্থির করে ধাপে ধাপে এগোনোই টেকসই ফলাফল এনে দেয়, একসঙ্গে সবকিছু করার চেষ্টা নয়।

একসঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টার বদলে একটি কাজ শেষ করে তারপর অন্যটিতে হাত দেওয়া উত্তম। গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক কাজ একসঙ্গে করলে প্রতিটির মান কমে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অজান্তে সময় নষ্ট হওয়া বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সময় অপচয়ের একটি কারণ। তাই নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত স্ক্রিনের দিকে না তাকানোর অভ্যাস অনেক সময় বাঁচিয়ে দিতে পারে। দিনের শুরুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে সেরে ফেলা, প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা এবং নিজের চেয়ে দক্ষ কেউ থাকলে ছোট দায়িত্ব অর্পণ করা—এসব ফলপ্রসূ জীবনযাপনের সাধারণ নিয়ম, যা যেকোনো বিশ্বাসের মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। একজন মুমিনের জন্য এই অভ্যাসগুলোর বিশেষত্ব হলো নিয়ত। কাজ যত ছোটই হোক, তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তবে তা নিছক দক্ষতার প্রদর্শনী নয়, বরং ইবাদতে পরিণত হয়।