প্রকৃতিকে জানার পদ্ধতি নিয়ে একটি ভিন্ন দার্শনিক অবস্থান তুলে ধরেছেন গবেষক ও লেখক মুসা আল হাফিজ। তাঁর বর্ণনায়, ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা নামক এই জ্ঞানতত্ত্ব প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে দুইটি পরস্পর পরিপূরক পথে বিভক্ত করে। প্রথম পথটি হলো পর্যবেক্ষণমূলক জ্ঞান, যা ইন্দ্রিয়, বিশ্লেষণ ও যুক্তির মাধ্যমে গঠিত। এখানে প্রকৃতি গবেষণার একটি বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়; মানুষ পরিমাপ, তুলনা ও কারণ-কার্য সম্পর্ক নির্ধারণ করে। এই পথটি প্রকৃতির কার্যপ্রণালি সম্পর্কে তথ্য দিতে সক্ষম হলেও তার অস্তিত্বগত অর্থ উন্মোচনে অসমর্থ। দ্বিতীয় পথটি হলো অংশগ্রহণমূলক উপলব্ধি, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এখানে প্রকৃতি কেবল পর্যবেক্ষণের বস্তু নয়, বরং পারস্পরিক সহাবস্থানের একটি ক্ষেত্র। এই উপলব্ধি গড়ে ওঠে শ্রদ্ধা, মনোযোগ ও নৈতিক সংবেদনশীলতার মাধ্যমে।

মুসা আল হাফিজের মতে, এই দুটি পথের সমন্বয়েই প্রকৃতির পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান সম্ভব। তিনি জ্ঞানের তিনটি স্তর চিহ্নিত করেছেন। প্রথম স্তর তথ্যগত জ্ঞান, যা প্রকৃতির পরিমাপযোগ্য দিক সম্পর্কে জানায়। দ্বিতীয় স্তর ব্যাখ্যামূলক জ্ঞান, যা সেই তথ্যের কার্যকারণ সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে। তৃতীয় স্তর প্রজ্ঞামূলক জ্ঞান, যা বাস্তবতার নৈতিক ও অস্তিত্বগত তাৎপর্য উপলব্ধি করায়। এই তৃতীয় স্তরটিকেই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার স্বাতন্ত্র্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জ্ঞানতত্ত্বে ফারাসাত বা অন্তর্দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও নৈতিক সংবেদনশীলতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি শাণিত উপলব্ধিশক্তি, যা কৃষকের বৃষ্টি বোঝা বা মাঝির নদীর মেজাজ অনুধাবনের মতো অভিজ্ঞতায় প্রকাশ পায়।

উদাহরণ হিসেবে নদীর প্রসঙ্গ টেনে লেখক ব্যাখ্যা করেছেন, নদীকে জানার অর্থ কেবল তার গভীরতা, প্রবাহের হার বা দূষণের মাত্রা নির্ণয় করা নয়। প্রকৃত অর্থে নদীকে জানা মানে তার সভ্যতাগত স্মৃতি, তীরে গড়ে ওঠা মানবজীবনের ইতিহাস এবং মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক অভিযোজন বুঝতে পারা। এই দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের ধারণাকে প্রসারিত করে তথ্যের বাইরে নিয়ে যায়—এখানে জ্ঞান হলো সামগ্রিক সম্পর্ক।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা আধুনিক বিজ্ঞানের বস্তুকরণের প্রবণতার সমালোচনা করে। কারণ, যাকে কেবল বস্তু হিসেবে জানা হয়, তার প্রতি দায়বদ্ধতা জন্মায় না। এই জ্ঞানতত্ত্বের দাবি, মানুষকে এমনভাবে দেখতে হবে যাতে সে সৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃতিকে জানার অর্থ তাকে মাপা নয়, বরং পাঠ করা; ব্যাখ্যা করা নয়, বরং শোনা; নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং তার সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করা। এই সম্পর্কনিষ্ঠ জ্ঞানই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি। লেখক মুসা আল হাফিজ ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত।