সৌরজগতের জন্মলগ্নে, আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে, শুক্র গ্রহের পরিবেশ ছিল আজকের চিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজ্ঞানীদের মতে, সেই সময় শুক্রের বুকে ছিল বিশাল মহাসাগর আর আকাশে ভেসে বেড়াত মেঘ। তখন সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ হওয়ায় পুরো সৌরজগতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রহ ছিল বুধ। কিন্তু ক্রমশ সূর্য আরও উজ্জ্বল ও তপ্ত হতে থাকায় শুক্র গ্রহের বায়ুমণ্ডলে সূচনা হয় এক ভয়াবহ ও অনিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউস প্রভাবের, যা ধীরে ধীরে শুক্রকে বুধের চরম তাপমাত্রাকেও বহুগুণে ছাড়িয়ে যেতে বাধ্য করে।

তবে বুধের অবস্থানও যে কম গরম তা নয়। সূর্যের আলো যে পিঠে পড়ে, সেখানে বুধের তাপমাত্রা প্রায় ৪৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে যায়, যা সিসার মতো কঠিন ধাতুকেও গলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সূর্যের এত কাছে থেকেও কেন শুক্র বেশি গরম? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দুই গ্রহের বায়ুমণ্ডলের গঠনগত পার্থক্যের মধ্যে, আর সেই পার্থক্যের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে গ্রিনহাউস প্রভাব।

গ্রিনহাউস প্রভাবের কথা শুনলেই সাধারণত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিবেশ দূষণ কিংবা পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার চিত্র। কিন্তু এই প্রভাব শুধু শুক্রকে জ্বলন্ত গ্রহে পরিণত করেনি; বরং একই প্রক্রিয়া আমাদের পৃথিবীকে হিমশীতল হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে জীবজগতের জন্য বসবাসের উপযুক্ত করে রেখেছে। যে কোনো বস্তু উত্তপ্ত হলে তার ভেতরের পরমাণু ও অণুগুলো কাঁপতে শুরু করে, আর এই কম্পনের ফলেই সৃষ্টি হয় তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ বা আলো। সূর্য যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে, তখন পৃথিবী সেই তাপ ইনফ্রারেড আলো হিসেবে মহাশূন্যে ফেরত পাঠাতে চায়, যা খালি চোখে দেখা যায় না।

এবার প্রশ্ন হলো, এই আলো ফেরত যাওয়ার পথে কোথায় যায়? বুধের মতো যেসব গ্রহের নিজস্ব বায়ুমণ্ডল নেই, সেখানে এই শক্তি সরাসরি মহাশূন্যে হারিয়ে যায়। ফলে বুধের সূর্য-মুখী পিঠ প্রচণ্ড উত্তপ্ত থাকে, আর অন্ধকার পিঠের তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কিন্তু পৃথিবীর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের বায়ুমণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও জলীয় বাষ্পের অণুগুলো গ্রিনহাউস গ্যাসের মতো কাজ করে এবং পৃথিবী থেকে নিঃসৃত আলোর বিকিরণ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলেই আটকে ফেলে। শীতের রাতে কম্বল মুড়িয়ে থাকার মতো এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর পৃষ্ঠকে উষ্ণ রাখে। বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস; কিন্তু গ্রিনহাউস গ্যাস না থাকলে তা নেমে যেত মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আর আমাদের পরিচিত সবুজ পৃথিবী পরিণত হতো এক বিশাল বরফের গোলকে। তাই জীবজগতের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট মাত্রার গ্রিনহাউস প্রভাব অপরিহার্য।

কী কারণে শুক্র পৃথিবীর মতো থাকতে পারল না? আদিতে পৃথিবী ও শুক্র দেখতে প্রায় একই রকম ছিল—আকারে সমান, দুই গ্রহেই ছিল প্রচুর পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড। গবেষকদের ধারণা, শুরুর দিকে শুক্রও ছিল নীল সাগর আর মেঘে ঢাকা একটি সুন্দর গ্রহ। কিন্তু সূর্য যখন আরও উজ্জ্বল হতে লাগল, তখন শুক্রের সাগরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উড়তে শুরু করল। পৃথিবীতে সাগর ও পাথর প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়, কিন্তু শুক্রের পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর সব কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হয়ে গেল তার বাতাসে। এরপর শুরু হলো এক ভয়ংকর চেইন রিঅ্যাকশন। বাতাসে গ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রহটি সূর্যের তাপ আটকে রাখতে লাগল, তাপ বাড়ায় অবশিষ্ট পানিও দ্রুত বাষ্প হয়ে গেল এবং গ্রহ হয়ে উঠল আরও উত্তপ্ত। এটিই অনিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউস প্রভাব।

ফলস্বরূপ, আজ শুক্র গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ৯৬ শতাংশই কার্বন ডাই-অক্সাইড, আর দিন-রাত সর্বদা তাপমাত্রা প্রায় ৪৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃথিবীর সব সাগরের পানি যদি বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যেত, তবে আমাদের চারপাশের বাতাস কতটা ভারী হতো—শুক্র গ্রহে ঠিক এমনটিই ঘটেছে। সেখানকার বিপুল গ্যাস ও বাষ্প মিলে বায়ুমণ্ডলকে এত ভারী করেছে যে শুক্রের পৃষ্ঠে বাতাসের চাপ পৃথিবীর চেয়ে ৯০ গুণ বেশি। আমাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। কয়লা, তেল ও গ্যাস পুড়িয়ে আমরা বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়াচ্ছি, ফলে পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে এবং উত্তর মেরুর হাজার বছরের বরফ গলতে শুরু করেছে। বরফের নিচে আটকে থাকা প্রাচীন পচা গাছপালা থেকে বাতাসে মিশছে ক্ষতিকর মিথেন গ্যাস, যা পৃথিবীকে আরও উষ্ণ করছে। তবে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করেছেন, পৃথিবী কখনোই শুক্রের মতো এত ভয়াবহ উত্তপ্ত হবে না; কিন্তু পরিবেশ নিয়ে সচেতন না হলে এই সুন্দর পৃথিবী আমাদের বসবাসের জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে উঠবে।