শাংহাই চিড়িয়াখানায় একটি উত্তরাঞ্চলীয় সাদা-গালসম্পন্ন গিবন যখন খাঁচায় ঢুকে পড়া ইঁদুরকে আদর করছিল, তখন গবেষক সিরিল গ্রুটার প্রথমবারের মতো বিষয়টি লক্ষ্য করেন। ইঁদুরটিকে খাওয়া বা তাড়িয়ে দেওয়ার বদলে গিবনটি অদ্ভুত কোমলতার সঙ্গে ছোট স্তন্যপায়ীটির যত্ন নিচ্ছিল। ঘটনাটি তাকে বিস্মিত করেছিল। পরবর্তীকালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের পাহাড়ে বন্য সাদা-কালো নাক বাঁদর নিয়ে গবেষণার সময় তিনি দেখেন, কিশোর বাঁদরগুলো বারবার গৃহপালিত শূকরের পিঠে ওঠার চেষ্টা করছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে প্রাইমেটদের আন্তঃপ্রজাতি মিথস্ক্রিয়া নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে প্ররোচিত করে।
সম্প্রতি তার সহকর্মীদের নিয়ে করা এক গবেষণায় ১৯৭০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রাইমেটদের অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ৪২৭টি নথিভুক্ত ঘটনা একত্র করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিজ্ঞানীরা আগে যতটা ভেবেছিলেন, এই ধরনের মিথস্ক্রিয়া তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক। বৈজ্ঞানিক জার্নাল, ছবি, ভিডিও এবং অন্যান্য প্রাইমাটোলজিস্টদের পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি এসব তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রথমে যা মনে হচ্ছিল কয়েকটি অদ্ভুত কাহিনি, ধীরে ধীরে তা প্রাইমেট আচরণের একটি বিস্তৃত দিক হিসেবে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী যে একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা করে, তা বিজ্ঞানীরা আগেই জানতেন। যেমন, মিশ্র প্রজাতির দলে চলাফেরা করলে বাঁদরদের শিকারি শনাক্তকরণ ক্ষমতা বাড়ে এবং খাদ্য সংগ্রহ সহজ হয়। আবার পাখিরা প্রায়ই বাঁদরদের অনুসরণ করে বনে ঘুরে বেড়ায়, কারণ বাঁদরদের চলাফেরায় পোকামাকড় উড়ে গেলে সেগুলো খেয়ে থাকে তারা। কিন্তু এই গবেষণায় সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার দিকটিতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যালোচনায় ৮৮টি প্রাইমেট প্রজাতির ১২৭টি অন্যান্য প্রাণী প্রজাতির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ঘটনা পাওয়া গেছে। ভেড়া, ট্যাপির, হরিণ, গৃহপালিত শূকর, বেড়াল, কুকুরের মতো স্তন্যপায়ী থেকে শুরু করে পেঁচা, টিকটিকি, ব্যাঙ এমনকি পোকামাকড়ও এর আওতায় ছিল।
আন্তঃপ্রজাতি মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ আচরণ ছিল খেলা এবং সাজসজ্জা (গ্রুমিং)। তবে প্রাইমেটরা অন্য প্রজাতির সদস্যকে বহন করা, জড়িয়ে ধরা, খাবার ভাগ করে নেওয়া এবং কখনও কখনও দত্তক নেওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ মিথস্ক্রিয়াই শুরু করেছিল প্রাইমেটরা। জাপানি ম্যাকাকদের হরিণের পিঠে ওঠা এবং সাজসজ্জা করার ঘটনা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দুই ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে শান্তিপূর্ণ মিথস্ক্রিয়ার এটি একটি অসাধারণ নজির। এছাড়া কাঠবেড়ালিকে আদর করা ল্যাঙ্গুর, ছোট বন্য শিশু বানরকে কোলে নেওয়া সিলভারব্যাক গরিলা, মঙ্গুসের বাচ্চাকে আলতো করে ধরে রাখা বোনোবো এবং পথহারা কুকুরকে সাজিয়ে দেওয়া ম্যাকাকের মতো কম পরিচিত পর্যবেক্ষণও গবেষকদের মুগ্ধ করেছে।
এই মিথস্ক্রিয়াগুলোর অনেকগুলোই প্রজাতির অভ্যন্তরে দেখা সুবিধার মতোই উপকার দিতে পারে। সাজসজ্জা পরজীবী দূর করতে, পরিচ্ছন্নতা বাড়াতে এবং সামাজিক বন্ধন জোরদার করতে সাহায্য করে। খেলা মোটর সমন্বয়, সামাজিক দক্ষতা এবং জ্ঞানীয় নমনীয়তার বিকাশে অবদান রাখে। কিছু মিথস্ক্রিয়া ঘটে তখন, যখন প্রাইমেটরা খাদ্য সংগ্রহের সুযোগ বা শিকারি থেকে সুরক্ষার কারণে অন্য প্রাণীদের সঙ্গে সময় কাটায়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে প্রাইমেটরা অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে যৌথভাবে গাছের চূড়ায় খাবার খোঁজে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বারবার সংস্পর্শের ফলে সাজসজ্জা বা খেলার মতো সামাজিক মিথস্ক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তবে সব পর্যবেক্ষণ এই ধাঁচের সঙ্গে খাপ খায় না। গবেষকরা বলছেন, প্রাইমেটদের মধ্যে অন্যান্য প্রজাতির প্রতি সামাজিক নমনীয়তা, কৌতূহল এবং সহনশীলতার যে ক্ষমতা রয়েছে, তা আগে গবেষকরা কল্পনা করতে পারেননি।
অল্পবয়সী প্রাইমেটদের অন্য প্রজাতির সঙ্গে খেলার প্রবণতা বেশি ছিল, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী প্রাইমেটরা সাজসজ্জায় বেশি যুক্ত ছিল। এটি প্রাইমেট সমাজে বয়স এবং লিঙ্গভেদে পরিচিত পার্থক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে কিশোররা খেলায় সময় কাটায় এবং স্ত্রীরা যত্নের কাজে বেশি বিনিয়োগ করে। তবে সব ঘটনাকে বন্ধুত্ব হিসেবে বর্ণনা করা ভুল হবে। কিছু ক্ষেত্রে প্রাইমেটরা অন্য প্রজাতির শিশুকে বহন করলেও রুক্ষ আচরণ বা অবহেলার কারণে আঘাত বা মৃত্যুও ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে অন্য প্রাণীর বাচ্চাকে অপহরণের মতো দেখায়, আবার কিছু মিথস্ক্রিয়া স্পষ্টতই সহিংস ছিল। বেশিরভাগ মিথস্ক্রিয়া স্বল্পস্থায়ী হলেও কিছু ঘটনা সপ্তাহ ধরে চলেছে। যেমন, ক্যাপুচিন বাঁদর একটি মার্মোসেটকে দত্তক নিয়েছিল। চিড়িয়াখানা বা মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা পরিবেশে কিছু প্রজাতি অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে। ২০১৭ সালে ইসরায়েলের একটি চিড়িয়াখানায় নিভ নামের একটি ম্যাকাক একটি মুরগিকে দত্তক নিয়ে নিজের বাচ্চার মতো যত্ন করেছিল।
এই গবেষণার ফলাফল সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বনভূমি খণ্ডিত হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা মানুষের, গবাদি পশু এবং গৃহপালিত প্রাণীর সংস্পর্শে আসছে। প্রাইমেটরা এখন আগের চেয়ে বেশি কুকুর, বেড়ালের মতো প্রাণীর মুখোমুখি হচ্ছে। কিছু মিথস্ক্রিয়া উপকারী হলেও অন্যগুলো বন্যপ্রাণী, গৃহপালিত প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কোন প্রজাতির মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি, তা বোঝা গেলে চিড়িয়াখানায় প্রাণী রাখার সিদ্ধান্ত উন্নত করা যাবে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই সম্পর্কগুলোর অন্তর্নিহিত কিছু উপাদান — কৌতূহল, সহনশীলতা, যত্ন এবং খেলা — সম্ভবত গভীর বিবর্তনীয় শিকড় রয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত সহযোগী অধ্যাপক সিরিল গ্রুটার দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত এই নিবন্ধটি লিখেছেন।




