ছোটবেলায় তিনজন শ্রোতার সামনেও কথা বলতে গিয়ে যিনি কাঁপুনি অনুভব করতেন, আজ সেই মানুষই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে যুক্তির অপেক্ষায় রূপান্তরিত করতে পারেন। জামালপুরের এক শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, ক্লাস নাইনে পড়া এক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন—‘আপু, আপনি এত সুন্দর করে কথা বলেন কীভাবে?’—আসলে তার জীবনে বিতর্কেরই অবদান। ক্লাস এইটে মাত্র তিনজনের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে কণ্ঠস্বর থরথর করে কাঁপত, হাতের তালু ঘামে ভিজে যেত এবং দুই বাক্য বলার পরই তিনি বাকি কথা ভুলে বসতেন।
এই শিক্ষার্থী বর্তমানে নিজ জেলায় একজন সুপরিচিত বিতার্কিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। একটি গণমাধ্যম আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় একাধিকবার অংশ নিয়ে তিনি বিজয়ও অর্জন করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তার জেলার জেলা প্রশাসক স্বয়ং হাত মিলিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘তুমি খুব ভালো কথা বলো। জীবনে এগিয়ে যাও।’ বিতর্ককে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তার এই পরিচয়।
বিতর্ককে ‘ভয় ভাঙার মেশিন’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের উদাহরণ দিয়েছেন। ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রায় সব স্কুলে সপ্তাহে ন্যূনতম একটি করে বিতর্কের ক্লাস নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। কারণ, জনসমক্ষে কথা বলার দক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তাধারা ছাড়া ভবিষ্যতের নেতা তৈরির পথ রুদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী অর্ধেক পেশায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে যোগাযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে তার প্রস্তাব হলো, প্রতিটি স্কুলে সপ্তাহে এক ঘণ্টার জন্য বাধ্যতামূলক বিতর্ক ক্লাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে আনুষ্ঠানিক ডিবেট ক্লাব থাকা উচিত যাতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, প্রকাশ্য বক্তৃতা ও সৃজনশীলভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা ব্যতীত আমরা নিজেদের রাষ্ট্রকেই সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারব না এবং আগামী প্রজন্মকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোলাও সম্ভব হবে না।
ডেল কার্নেগি যে বক্তব্যটি দিয়েছিলেন, সেটি উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘পৃথিবীর সর্বোচ্চ মূল্যবান দক্ষতা হলো মানুষের সম্মুখে কথা বলার দক্ষতা।’ বিতর্কের অনুশীলন একজনকে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে শান্ত মস্তিষ্ক বজায় রেখে বক্তব্য দেওয়া শেখায়। যে শিক্ষার্থী এটি পারবে, সে জীবনের প্রতিটি স্থানে অগ্রগতি বজায় রাখবে। তাছাড়া, নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ‘একটি কলম, একটি বই, একজন শিক্ষক পৃথিবী বদলাতে পারে।’ বিতর্ক আসলে সেই কলম হাতে তোলার প্রশিক্ষণ। এটি মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে উৎসাহিত করে—‘প্রমাণ কী?’, ‘ভিন্ন মত কোথায়?’ শিক্ষা শুধু সনদপত্রের নাম নয়; শিক্ষার প্রকৃত অর্থ হলো নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা উদ্যোক্তা—পরিশেষে সবারই অন্যদের বোঝানোর প্রয়োজন হয়।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পঙ্ক্তি ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’—এটি উল্লেখ করে শেষ মন্তব্য করা হয়, সেই নবীনদের যুক্তি দিয়ে কথা বলার জায়গা না দিলে তারা কীভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে? আমরা চাই না পরবর্তী বংশ মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করুক; বরং আমরা চাই তারা মঞ্চে উঠে বলুক, ‘আমার বক্তব্য শুনে মানুষ চিন্তা করতে শিখছে।’ একটি জাতির উন্নতি তখনই নিশ্চিত হয় যখন সেখানকার তরুণ প্রজন্ম নির্ভীভাবে যুক্তিপূর্ণ কথা বলতে সক্ষম হয়। আর সেই আত্মবিশ্বাসের প্রথম বিদ্যালয় হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত স্কুলের বিতর্ক ক্লাব।




