মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পাহাড়ি আবাসে জুলাই আন্দোলনের প্রাক্কালে অবস্থান করছিলেন লেখক। সেখানে সামাজিক মাধ্যমের নাগালের বাইরে থাকার পর ঢাকায় ফিরে তিনি দেখতে পান রাজপথ রক্তে রাঙা হয়েছে এবং ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারগুলো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আরও আবিষ্কার করেন, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কিছু তরুণ-তরুণী তাঁর প্রাক্তন ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুবাদে তাদের অনেকেই তাঁর ক্লাস করেছিল। এই উপলব্ধি থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আন্দোলনের সমন্বয়কদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কারণ, ইতিহাস রচনায় দলিল সংরক্ষণের অভাবের কারণেই গল্পকথনের প্রাধান্য বেশি। দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অধিকাংশই স্মৃতিকথা বা তথ্য লিপিবদ্ধ করেননি, ফলে আন্দোলনের কার্যকারণ ও কর্মপদ্ধতি বোঝা দুরূহ হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি ঢাকায় এসে প্রথমে মুখ্য সমন্বয়কদের একটি তালিকা তৈরি করেন। কাজটি জটিল ছিল, কারণ আন্দোলনের কোনো সুসংহত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিউক্লিয়াস নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা শুধু দাবি ও ঘোষণা জারি করেই দায়িত্ব পালন করেছিল। ক্যাম্পাসভিত্তিক নেতৃত্বে কাউকে সমন্বয়ক পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ দায়িত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়রেখা অনুসরণ করে রাজপথে ছিল। বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করা হয়।
এ সময় লক্ষ্য করা যায়, আন্দোলনের কৃতিত্বের ভাগ নেওয়ার প্রতিযোগিতা চরমে উঠেছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়করা আলোচনায় এলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা চাপা পড়ে যাচ্ছে। অথচ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রাণসঞ্চার করেছিল তারাই। নিহত শিক্ষার্থীদের বড় অংশও মূলত এই দুটি শ্রেণির। সরকারি চাকরির কোটায় তাদের জায়গা কম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে যায় খুব কম। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তো সনদের স্বীকৃতিই নেই। লেখকের প্রশ্ন ছিল, কী উন্মাদনায় তারা আন্দোলনে অংশ নিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে। তিনি ফোকাস করেন এই দুই ধারার সমন্বয়কদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহের দিকে।
এক সমন্বয়ক ব্যাখ্যা করেন, কোটা সংস্কার কীভাবে মাদ্রাসাপড়ুয়ার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো মাদ্রাসায় পড়ি, কিন্তু আমার ছোট ভাই বা বোন বা কাজিন পড়ে কলেজ বা ভার্সিটিতে। তাই কোটা সংস্কার ইস্যু আমার পরিবার এবং আমার ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে। ভাই হিসেবে সে বাস্তবতা অস্বীকার করি কী করে?’
সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও সম্পাদনা লেখকের জন্য ছিল বিস্ময়কর ও বিরল অভিজ্ঞতা। যেসব তরুণ রাজপথ উত্তাল করেছিল, গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল, তাদের প্রত্যেককেই তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও আটপৌরে হিসেবে পেয়েছেন। সহিংসতার অভিঘাতে তারা তখনও বিহ্বল, অনেকে পোস্টট্রমাটিক সিনড্রোম ও মানসিক অবসাদে ভুগছে। সাক্ষাৎকারগুলো সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণা ভেঙে দেয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়করা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান নন; তাদের রাজনৈতিক সচেতনতাও অপ্রতুল নয়। অধিকাংশের রাজনৈতিক বোঝাপড়া প্রকট এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা প্রচণ্ড আশাবাদী।
সিংহভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, যাদের জীবনে আর্থিক টানাপোড়ন বাস্তবতা। বিগত ১৫ বছরের মধ্যবিত্তের হতাশাজনিত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছিল এই আন্দোলন। প্রচলিত ছাত্ররাজনীতিতে অনেকের হাতেখড়ি না থাকলেও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়। সরকারের সহিংস আচরণ নাগরিক অধিকারের ধারণা উন্মেষ ঘটায়। মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্যও এই বাস্তবতা শতভাগ প্রযোজ্য। মাদ্রাসার ছাত্র মানেই দুস্থ বা সমাজবিচ্ছিন্ন—এই ধারণা ভুল। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী এখন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে এবং অনেকে সাধারণ শিক্ষাক্রমেও অংশ নেয়। রাজনৈতিকভাবেও তারা সচেতন, তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তাদের জীবনেও বিপ্লব ঘটেছে।
অনেক মাদ্রাসা সমন্বয়ক ইসলামি ধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড ও মোদিবিরোধী বিক্ষোভের স্মৃতি তাদের রাজনৈতিক চেতনাকে গভীর করেছে। পর্দা করেও কিছু মাদ্রাসা ছাত্রী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল, যা সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। মাদ্রাসাপড়ুয়াদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য, উপেক্ষা ও অবহেলা তাদের মনকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। ‘জঙ্গি’ তকমার আতঙ্ক তাদের জীবনে আরেক বিভীষিকা। সন্ত্রাস দমনের নামে নিরীহ ছাত্ররা গুম, খুন ও অপহরণের শিকার হয়েছে, পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়েছে। চরমপন্থী মতাদর্শের কেউ কেউ মাদ্রাসায় থাকলেও সংখ্যা বেশি ছিল না, কিন্তু এর খেসারত দিতে হয়েছে অসংখ্য নিরীহ ছাত্রকে। পুঞ্জীভূত চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানে।
সাক্ষাৎকারে মানবিকতার গল্পও উঠে এসেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ইব্রাহিম মুন্না বনানী ফ্লাইওভারের কাছে ঘটে যাওয়া এক কাহিনি বলেন। গুলিবিদ্ধ ৮-১০ বছরের এক পথশিশুকে রাস্তায় পড়ে কাতরাতে দেখেন তিনি, কিন্তু গুলির তোড়ে জনতা শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারেনি। পরে মুন্না শিশুটিকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে যুবলীগের হামলার ভয়ে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় কর্তৃপক্ষ। উত্তেজিত জনতা হাসপাতাল ভাঙচুরে উদ্যত হলে শিশুটিকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। মুন্না তার পাশে ছিলেন পুরো সময়। শিশুটি মুন্নাকে ‘ভাই’ ডেকে ছেড়ে না যেতে মিনতি করে। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।
আন্দোলন-উত্তর সময়ে নাগরিক দায়িত্ব পালনের আগ্রহ থেকে অনেকে রাজনীতিতে অংশ নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নেতৃত্বের কূটচাল লক্ষ করে প্রায় সবাই পিছু হটে। দেশ গঠনে দায়িত্ব পালনের আকাঙ্ক্ষা অনেক সাক্ষাৎকারেই লিপিবদ্ধ হয়েছে। গণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উদ্ভব। এটি ইতিহাসের প্রথম জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক সফল তৃণমূল আন্দোলন, যা চরিত্রে স্বতঃস্ফূর্ত ও পরস্পরযুক্ত কিন্তু বিকেন্দ্রিত ছিল। নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন আন্দোলনকে মহত্ত্বের গরিমা দিয়েছে। সাধারণ ঘরের সন্তান সমন্বয়করা আস্থা অর্জনে সক্ষম হন এবং আন্দোলনের শেষে গুটিকয়েক ছাড়া অধিকাংশ ফিরে গিয়েছে পড়াশোনার বৃত্তে। সময়ের ডাকে সাড়া দেওয়া এই সাহসী যুবকেরা ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে থাকবেন।



