এশিয়ার অন্যতম প্রধান সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যার সমস্যা। আয়ু বাড়ছে, অন্যদিকে জন্মহার কমছে—ফলে শ্রমশক্তি সঙ্কুচিত হওয়ার পাশাপাশি বয়স্ক মানুষের অনুপাত বেড়েই চলেছে। এই সমস্যাটিকে সাধারণত রাজস্ব ঘাটতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়: স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ায় সরকারি অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, আর কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমায় কর রাজস্বে টান পড়ে। তবে ফরচুনের বিশ্লেষণে এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘায়ু অর্থনীতির ওপর বোঝা না বরং শক্তি জোগাতে পারে, যদি সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
এটা সত্য যে বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও ব্যয় বাড়ে। ক্রনিক রোগ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে আরও ব্যয়বহুল নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ছে। আসীন জীবনযাপন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসার সহজলভ্যতাও এই ব্যয়বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বার্ধক্যকে অর্থনৈতিক টান হিসেবে না দেখে বরং সঠিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এটিকে একটি 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'-এ পরিণত করা সম্ভব। জনসংখ্যা বয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যনীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি—বিশেষ করে শ্রমবাজার ও প্রবৃদ্ধি নীতি—অভিন্ন হয়ে উঠবে। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানুষকে দীর্ঘকাল সুস্থ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখতে পারে, যা পুরো অর্থনীতিকেই সচল রাখবে।
সিঙ্গাপুর ও জাপানের উদাহরণ দিয়ে এই প্রতিবেদন দেখিয়েছে যে ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যব্যয় মানেই অস্থিতিশীল ব্যয় নয়। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সরকারি ভর্তুকির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক চিকিৎসা সঞ্চয় ও সহ-অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে, যা নাগরিকদের নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যয়ের দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করে। 'থ্রি এম' কাঠামো—মেডিসেভ, মেডিশিল্ড লাইফ ও মেডিফান্ড—মাধ্যমে খরচ নিয়ন্ত্রণ ও সুলভ সেবা নিশ্চিত করা হয়। 'হেলথিয়ার এসজি' ও 'এইজ ওয়েল এসজি'-র মতো নীতির মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিচর্যার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মূল্য স্বচ্ছতার মতো সরবরাহ-পক্ষের পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে জাপান সার্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে সমান ও ব্যাপক সেবা প্রদান করে, যেখানে জাতীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ফি তালিকা চিকিৎসার মূল্য নির্ধারণ করে। 'হেলথ জাপান ২১' উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, ডিজিটালাইজেশন, চিকিৎসা ফি নিয়মিত পর্যালোচনা ও স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পদ্ধতি ভিন্ন হলেও—সিঙ্গাপুরে বাধ্যতামূলক সঞ্চয় ও খরচ ভাগাভাগি, জাপানে সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা—উভয় দেশের মূল দর্শন এক: স্বাস্থ্যব্যবস্থায় 'বেশি খরচ করা' নয়, বরং 'ভালো খরচ করা' জরুরি। সেবা প্রদানের দক্ষতা বাড়ানো, সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিচর্যা শক্তিশালী করা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ—এগুলো দীর্ঘমেয়াদি খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যের ফলাফল উন্নত করতে পারে। উভয় দেশই সুস্থ বার্ধক্যকে শুধু স্বাস্থ্য লক্ষ্য নয়, অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখে। উন্নত স্বাস্থ্যের কারণে বয়স্ক ব্যক্তিরা দীর্ঘকাল কর্মক্ষম থাকতে পারেন, যা সঙ্কুচিত কর্মশক্তির প্রভাব প্রশমিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সমর্থন করে। সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার নীতি জীবনব্যাপী শিক্ষা, ক্যারিয়ার পরিবর্তন, পুনর্নিয়োগ ও বয়স-বান্ধব কর্মক্ষেত্রকে উৎসাহিত করে। জাপানও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময়ে বয়স্ক কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য। এই নীতিগুলোর কারণেই জাপান ও সিঙ্গাপুর বয়স্ক কর্মীদের মধ্যে সুস্থ আয়ু ও শ্রমবাজার অংশগ্রহণ উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানে রয়েছে।
আসিয়ান+৩ দেশগুলোর—যেখানে আসিয়ান সদস্যরা চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে রয়েছে—জনমিতিগত পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলো সাধারণত ভালো স্বাস্থ্যের ফলাফল দেখালেও, সিস্টেম ডিজাইন ও সেবা প্রদানের কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন জাপানের জাতীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ফি তালিকা দক্ষ সেবা প্রদানে সহায়ক। কিছু আসিয়ান দেশে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি বা ভৌগোলিক অসম বণ্টন সমস্যা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, চিকিৎসা সেবার প্রবেশাধিকার সীমিত করে। জাপান ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনটি মূল শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে: প্রথমত, স্বাস্থ্যকৌশলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর বেশি জোর দেওয়া। দ্বিতীয়ত, ব্যয়ের মাত্রার চেয়ে ফলাফলের দিকে নজর দেওয়া। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ও শ্রমবাজার নীতির মধ্যে সংযোগ আরও দৃঢ় করা। জীবনব্যাপী শিক্ষা, বয়স-বান্ধব কর্মক্ষেত্র ও নমনীয় কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বয়স্কদের কর্মীশক্তিতে রাখা সম্ভব। বার্ধক্য এশিয়ার অর্থনীতিকে যে কোনোভাবেই পরিবর্তন করবে, তবে নীতিনির্ধারকদের হাতে এখনও সুযোগ আছে—এটি রাজস্ব বোঝা হবে নাকি প্রবৃদ্ধির সুযোগ হবে, তা নির্ধারণের। জাপান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, বার্ধক্য ব্যবস্থাপনা শুধু খরচ নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘ কর্মজীবনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি সম্ভব।



