সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে একটি ঘটনা সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। যখন একজন নারী প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একটি গান গেয়ে স্বাভাবিক আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন, তখন সেই ব্যক্তিগত মুহূর্তকে কেন্দ্র করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার প্রয়াস ঘটে। উদ্দেশ্য ছিল একজনের মাধ্যমে সবাইকে ভয় দেখানো, কিন্তু ফলাফল হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। হাজারো মানুষ কোনো গালিগালাজ বা ঘৃণা ছড়ানো ছাড়াই, শুধুমাত্র একই গান গেয়ে এবং ভিডিও তৈরি করে নান্দনিকভাবে প্রতিবাদ জানান। এই প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয় যে, সংস্কৃতি নিজেই একটি প্রতিরোধী ভাষা হয়ে উঠতে পারে, যা সৌন্দর্যের মাধ্যমেও অন্ধকারকে পরাজিত করতে সক্ষম।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে সংস্কৃতির চর্চা মানুষের ভেতরের স্বাধীন চিত্তকে জাগিয়ে তোলে। যে সমাজে গান, কবিতা, নাটক আর চিত্রকলা জীবনের অঙ্গ, তাকে দীর্ঘদিন ভয় দেখিয়ে বা দমন করে রাখা সম্ভব নয়। কারণ সংস্কৃতি মানুষের আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলে। পৃথিবীজুড়ে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সংগীত হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, লাতিন আমেরিকায় কবিতা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে একাত্ম করেছিল। একটি পুলিশের লাঠি যেখানে দেহে আঘাত করতে পারে, একটি কবিতা সেখানে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না, তা ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও গান ও কবিতা যোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে এবং একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে সহায়তা করেছে।
বর্তমান সমাজে এক ধরনের শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে যারা মানুষের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় থাকে, বিশেষ করে নারীর স্বাধীনতা তাদের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়। এর কারণ হলো একজন স্বাধীন নারী শুধু নিজের জীবনই বদলান না, তিনি প্রশ্ন করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের পছন্দের প্রতি মূল্য দেওয়ার মতবাদ পুরো সমাজ ও আগামী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজ যুগে যুগে নারীর পোশাক, চলাফেরা, সংগীতচর্চা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুরো সমাজকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতি যে আত্মপ্রকাশের অধিকার মানুষকে দেয়, তা নারীর জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। একজন নারী যখন গান করেন বা নিজের আনন্দ ভাগ করেন, তখন তিনি কেবল একটি শিল্পকর্ম নির্মাণ করেন না, তিনি তার অস্তিত্বকেও দৃশ্যমান করে তোলেন। এ দৃশ্যমানতাই অনেকের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে।

ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে প্রায়শই যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, তার অবসান জরুরি। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, উপাসনা ও আধ্যাত্মিক জীবনের অনুষঙ্গ; আর সংস্কৃতি হলো ভাষা, সাহিত্য, পোশাক, উৎসব ও জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রকাশ। লালন, হাসন রাজা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন ও আব্বাসউদ্দীনের সৃষ্টি এ সত্যই ধারণ করে যে, তাদের সাহিত্য কখনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়নি, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্কৃতির এই ভূমিকাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। এটি ঘৃণা ছড়ানোর পাশাপাশি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক জাগরণ ও সংহতির ক্ষেত্রও তৈরি করছে, যা কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছাড়াই সমাজে প্রতিরোধের শক্তি জোগায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ পঙক্তি কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা মানবমর্যাদা ও মুক্তির পক্ষে যে সাহসের আগুন জ্বালিয়েছিল, তার মূল চেতনা এখানেই নিহিত। একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের ওপর। যদি সমাজের সকল স্তরের মানুষ—কৃষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী, পুরুষ, তরুণ ও প্রবীণ—এই চেতনার অংশ না হন, তবে তা দুর্বল থেকে যায়। সমাজে এমন একটি পরিবেশ আবশ্যক, যেখানে প্রশ্ন করার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও শিল্পচর্চা নির্ভয়ে সম্পন্ন হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ঘৃণা ও ভয়ের স্থায়িত্ব সাময়িক, কিন্তু একটি ভালো গান বা কবিতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে। তাই মুক্ত সমাজের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস অস্ত্রধারীদের নয়, সাংস্কৃতিক নির্মাতাদেরই মনে রাখে; কারণ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, কিন্তু একটি সাহসী কবিতা কিংবা গান থেকে যায় চিরকাল।