পৃথিবীতে কিছু জিনিস উল্টো হলে সমস্যা, আবার কিছু বস্তু সোজা না হলে বিপত্তি। যেমন বিপরীত দিকে গাড়ি চালনা এক ধরনের অপরাধ, কিন্তু বর্তমান যুগে অসংলগ্ন কথা বলে খ্যাতি অর্জন করাকে মনে করা হয় এক ধরনের মেধার স্বাক্ষর। যুক্তিনিষ্ঠ কথায় কেউ মনোযোগ দেয় না, কিন্তু যদি কয়েকটি অদ্ভুত বক্তব্য দিতে পারেন, তাহলে অত্যল্প সময়ে জাতীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যাওয়া যায়।

তবে এই বদলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা রাজনীতির ময়দানে নয়, বরং দেখা যায় মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে। নির্দিষ্ট কিছু অফিসে এমন ব্যক্তিদের দেখা মেলে, যাঁদের প্রকৃত পেশাগত নাম যাই হোক, মূল পরিচয় হচ্ছে ‘শাসক দলের স্থায়ী যুগ্ম সভাপতি’। রাষ্ট্রের প্রশাসন বদলে যেতে পারে, মন্ত্রিসভার সদস্য বদলে যেতে পারে, এমনকি অফিসের আসনও বদলে যেতে পারে, কিন্তু এই ব্যক্তি কখনই বিরোধী শিবিরে যোগ দেন না। তাঁরা সর্বাত্মকভাবে ক্ষমতাসীনদের কাতারেই থাকেন। মনে হয় যেন তাদের নিয়োগপত্রেই নির্দেশ জারি করা আছে— ‘শাসকগোষ্ঠীর সাথে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে’।

এই প্রসঙ্গে এক পরিচিতজনের গল্প স্মৃতিতে উঁকি দেয়। মনে করা যাক, তার নাম মকবুল সাহেব। প্রতিবছর তাকে প্রশ্ন করা হতো, ‘আপনার বর্তমান বয়স কত?’ তিনি নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে উত্তর দিতেন, ‘৪৭’। পরের বছরও একই জিজ্ঞাসায় বলতেন, ‘৪৭’। আবারো বছর ঘুরলে? উত্তর অপরিবর্তিত ‘৪৭’। একপর্যায়ে সম্মিলিতভাবে তাকে চাপ দেওয়া হলে তিনি বললেন, ‘আমি নিজের কথায় অটল। গত বছর ৪৭ বলেেছি, এখন এর বেশি কিভাবে বলি?’ নৈতিকতায় এমন দৃঢ়পূর্ণতা বর্তমান সময়ে সচারচর চোখে পড়ে না।

আমাদের বাস্তবতায় আরেকটি দল আছে, যাদের নৈতিক অবস্থানও ঠিক মর্বুল সাহেবের মতোই অবিচল। তারা সব সময়ই ক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে একটিমাত্র সমস্যা হলো, ক্ষমতার রেখা যে পথে ধাবিত হয়, তাদের নীতি আদর্শও ঠিক সেদিকেই মোড় নেয়। পতনের পর এই লোকগুলোর আমূল রূপান্তর চোখে পড়লে মনে হয়, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। আমরা আলোর বেগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, কিন্তু ক্ষমতার গতিবেগের সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আরও দ্রুতগতি পরিবর্তিত হতে পারে, সেটা হয়তো বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভাবনারও বাইরে ছিল।

কিছুদিন আগেও যেসমাজের একটি অংশের সামাজিক মাধ্যমের প্রচ্ছদ ছবি, প্রোফাইল চিত্র, ব্যানার ও স্ট্যাটাস—সবকিছু এক বিশেষ রঙে রঞ্জিত ছিল, আজ সেই জায়গায় সম্পূর্ণ বিপরীত রঙের জয়কার। এত দ্রুত রঙ বদলাতে দেখে গিরগিটিও সম্ভবত পেশা ছেড়ে দিয়ে বনে জঙ্গে আক্ষেপ করে ভাবে, ‘আমি শুধু ত্বকের রঙ বদলাই, কিন্তু এরা তো ইতিহাস পাল্টে দেয়।’ আরও একটি মজার দিক হলো, বিগত সতেরো বছরে যাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখাই যায়নি, তারাই এখন সবচেয়ে প্রাচীন সক্রিয়কর্মী। তাদের আত্মবিশ্বাস দেখে ধারণা জন্মায়, তারা দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের তালিকাভুক্ত ছিলেন, কিন্তু নথিতে অসাবধানের কারণে তাদের নাম মুদ্রিত হয়নি।

এসব লোকজনের স্মৃতিশক্তিও অত্যন্ত চমকপ্রদ। অতীতের কোনো স্থিরচিত্র সামনে ধরলে তারা দাবি করেন, ‘এটা সম্পাদিত’। পূর্বের পোস্টের কথা বললে বলেন, ‘অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল’। পুরোনো ভিডিওচিত্র দেখালে বলেন, ‘এটা গভীর নকল’। প্রতিটি ঘটনারই ব্যাখ্যা আছে, কেবল নিজের মত পরিবর্তনের যৌক্তিকতা অনুপস্থিত। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই ব্যক্তিরা কখনো ভুল স্বীকার করেন না। কারণ ইতিহাসের সাথে তারা নিজেদের মানিয়ে নেন, ইতিহাস তাদের জন্য নয়।

বাতাস যে দিক থেকে প্রবাহিত হয়, সেই দিকেই তাদের আদর্শের পতাকা উড়তে থাকে। মূলনীতি? সেটি আলমারির মধ্যে ভাঁজ করে সংরক্ষিত থাকে। প্রয়োজনের সময় বের করা হয়, আবার যখন প্রয়োজন শেষ, তখন সেটি গুটিয়ে রাখা হয়। একসময়ের বাণী ছিল, ‘সততা সবচেয়ে ভালো নীতি’। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হয়, নতুন একটি প্রবচন হওয়া প্রয়োজন: ‘যেদিকে বাতাস, সেদিকে যাও, আমি সর্বদা শাসকগোষ্ঠীর একাগ্র সেবক’।

ফলে এখন আর কাউকে প্রশ্ন করা হয় না, ‘আপনি কোন মতাদর্শের?’ বরং জানার আগ্রহ হয়, ‘আগামী সপ্তাহে আপনি কোন শিবিরে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন?’ কারণ আমাদের এই ভূখণ্ডে ঋতু পরিবর্তনের তুলনায় যদি কিছু দ্রুত রূপ বদলায়, তবে তা হলো কিছু মানুষের রাজনৈতিক স্বরূপ। আর সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা মঞ্চক দর্শকের মতো চুপচাপ উপলব্ধি করি, কিভাবে উল্টে যাওয়া মানুষগুলো অসাধারণ দক্ষতায় নিজেদের পুনরায় বদলে ফেলে।