গত সপ্তাহজুড়ে ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক স্টক্স ইউরোপ ৬০ প্রতিদিনই বেড়েছে, যা জুনের পর থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ লাভের ধারা। ব্ল্যাকরকের ইন্টারন্যাশনাল চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার হেলেন জুয়েল বলেছেন, ইউরোপ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। এই অঞ্চলের স্থিতিস্থাপকতা বাজারকে অবাক করেছে এবং চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
মূলত কয়েকটি কারণে ইউরোপের শেয়ারবাজারে এই জোয়ার আসছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় শেয়ারগুলো মার্কিন শেয়ারের তুলনায় অনেক সস্তা ছিল, যা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের একটি বড় কারণ ছিল। কিন্তু এখন ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ আয় বৃদ্ধি দেখিয়েছে এবং অর্থনৈতিক গতিও ২০২৩ সালের মার্চের পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী। ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার মার্ক হ্যাফেলে মনে করেন, এ প্রান্তিকে আয় প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ইউরোপীয় শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ানোর সময় এখনই উপযুক্ত।
বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। ব্যাংক অব আমেরিকার জরিপ অনুযায়ী, জুনে ১৫ শতাংশ ফান্ড ম্যানেজার ইউরোপীয় শেয়ারের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন নিট ২ শতাংশ ম্যানেজার ইউরোপীয় শেয়ারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করছেন। সিটিগ্রুপের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহে একমাত্র ইউরোপেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে স্টক্স ৬০ সূচক নতুন রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই বছর স্টক্স ৬০ সূচক ১১ শতাংশ বেড়েছে। জার্মানির ডিএএক্স, ফ্রান্সের সিএসি ৪০ এবং ইতালির এফটিএসই এমআইবি সূচকগুলো নতুন সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। শুধু কয়েকটি বড় কোম্পানি নয়, বাজারের বিস্তৃত অংশ এই উত্থানে অংশ নিচ্ছে। স্টক্স ৬০-এর অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৭৫ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার ২০০ দিনের চলমান গড়ের উপরে লেনদেন হচ্ছে, যা গত দশকের সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাসও এই বাজারের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সংঘাত প্রশমনের লক্ষণ দেখা যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মনোভাব উন্নত হয়েছে, তবে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ খোলা নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়েছে। জুলাইয়ের শীর্ষ থেকে তেলের দাম কমায় মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাও কমেছে। সিটিগ্রুপের ইউরোপীয় ইক্যুইটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান বেটা মান্থে বলেছেন, ভূরাজনৈতিক কারণে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, কিন্তু সেই অবস্থা কাটিয়ে উঠলে ইউরোপীয় শেয়ারের চাহিদা আরও বাড়বে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও ইউরোপের বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। প্রথম দিকে প্রযুক্তি খাতে বিপুল ব্যয়কে পুরস্কৃত করা হলেও এখন বিনিয়োগকারীরা সেই ব্যয় থেকে উপকৃত হবে এমন খাত এবং এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে যারা মুনাফার মার্জিন বাড়াতে পারবে এমন কোম্পানিগুলো খুঁজছেন। ইউরোপের সেমিকন্ডাক্টর সংস্থা এএসএমএল এবং ইনফিনিয়ন টেকনোলজিসের শেয়ার ২০২৬ সালে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ব্যাংক অব আমেরিকার একটি সূচক অনুযায়ী, ইউরোপীয় এআই গ্রহণকারী কোম্পানিগুলোর (যেমন এবিবি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং ইওন) শেয়ার এ বছর ১৪ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্কিন হাইপারস্কেলারদের ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি।
এদিকে এআই ট্রেডের অস্থিরতার মধ্যে ব্যাংক এবং শিল্প পণ্যের মতো ইউরোপের অর্থনীতি-কেন্দ্রিক খাতগুলো প্রযুক্তির বিকল্প হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। স্টক্স ৬০ ব্যাংক সূচক এ বছর ২২ শতাংশ বেড়ে শীর্ষ লাভকারীদের মধ্যে রয়েছে। সিটির মান্থে বলেন, এআই-এর গতি আবার বাড়লেও বিনিয়োগকারীরা এই খাতের অস্থিরতা সম্পর্কে সচেতন, তাই প্রযুক্তি এখন পরিপূরক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চক্রাকার খাতে বৈচিত্র্য আনাও ইউরোপীয় শেয়ারের জন্য সুবিধাজনক।
স্টক্স ৬০ সূচক এখন ১৫ গুণ ফরোয়ার্ড আর্নিংয়ে লেনদেন হচ্ছে, যা এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর তুলনায় চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছাড়। তবে কিছু বাজার বিশ্লেষক এখনও ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান। ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ালে ইউরোপীয় শেয়ারের গতি ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করেন এডমন্ড ডি রথসচাইল্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ফান্ড ম্যানেজার আরিয়ান হায়াতে। তবে তিনি যোগ করেন, সামগ্রিক দিক এখনও ইতিবাচক। ইএফজি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ডেপুটি চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার ড্যানিয়েল মারে বলেছেন, শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভালো আয়ের সম্ভাবনার কারণে ইউরোপীয় শেয়ার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সংশয় অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। এখন নেতিবাচক অবস্থান থেকে মনোভাব উন্নত হওয়ায় এটি একটি ভালো সংমিশ্রণ।




