যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়ার আর্ক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তারা প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে একদম নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, বিজ্ঞানীরা এআইকে প্রাকৃতিক ডিএনএর গঠন চিনতে শিখিয়েছেন এবং সেই ডেটা ব্যবহার করে এআই সম্পূর্ণ নতুন ভাইরাস তৈরির নিজস্ব নকশা তৈরি করেছে।

গবেষণার শুরুতে বিজ্ঞানীরা এআই মডেল 'ইভো'কে হাজার হাজার প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব ও ভাইরাসের বিশাল জিনগত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। সব মিলিয়ে ইভো প্রায় ৯ লাখ কোটি (৯ ট্রিলিয়ন) নিউক্লিওটাইডের তথ্য বিশ্লেষণ করে। প্রশিক্ষণের পর ইভো জীবজগতের নানা জিনের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিয়মগুলো আয়ত্ত করে ফেলে এবং নতুন জিনের নকশা তৈরি করতে শুরু করে। ডিএনএ মূলত নিউক্লিওটাইড নামক অণু দিয়ে তৈরি লম্বা শিকলের মতো, যেখানে A, C, G এবং T—এই চারটি রাসায়নিক সংকেত পরপর সাজানো থাকে। ভাষার মতো ডিএনএরও নিজস্ব কিছু নিয়ম রয়েছে, যা জীববিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পারেননি।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণকারী 'ফাই এক্স-১৭৪' ভাইরাসকে বেছে নেন, কারণ জটিল জিনোমের তুলনায় এর গঠন সহজ এবং এটি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। ফাই এক্স-১৭৪ বিজ্ঞানের ইতিহাসে বেশ বিখ্যাত—১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী ফ্রেডরিখ স্যাঙ্গার প্রথমবারের মতো এই ভাইরাসের ডিএনএ জিনোম সিকোয়েন্স করেছিলেন, যা ছিল মানব-ইতিহাসে সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স করা প্রথম ডিএনএ জিনোম। বিজ্ঞানীরা ইভোকে এই ফাজ ভাইরাস ও এর সঙ্গীদের গঠন শেখানোর পর সেটি প্রায় ৭ লাখ নতুন ভাইরাসের নকশা তৈরি করে।

সেখান থেকে সম্ভাবনাময় ২৮৫টি নকশা নিয়ে গবেষকেরা গবেষণাগারে কৃত্রিম ডিএনএ তৈরি করে তা ব্যাকটেরিয়ার ভেতর প্রবেশ করান। পরীক্ষায় দেখা যায়, ইভোর তৈরি ১৬টি জিনোম থেকে সফলভাবে সম্পূর্ণ নতুন কৃত্রিম ভাইরাস তৈরি হয়েছে, যা বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। এমনকি কিছু কৃত্রিম ভাইরাস প্রাকৃতিক ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত বংশবৃদ্ধি করছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কৃত্রিম ভাইরাসগুলো অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পারছিল, যা প্রমাণ করে তারা সত্যিই টিকে থাকতে সক্ষম।

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনথেটিক বায়োলজিস্ট প্যাট্রিক কাই এই সাফল্যকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে অনেক বড় অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এই গবেষণা নতুন এক দুশ্চিন্তাও তৈরি করেছে। অনেকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব বিষাক্ত জীবাণু কিংবা ছোঁয়াচে মহামারি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক জৈব অস্ত্র বানানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির গবেষক মরিটজ হ্যাঙ্ক জানান, বিজ্ঞান যেভাবে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, সেই তুলনায় বিপজ্জনক ভাইরাস বানানো ঠেকানোর সরকারি ও বৈজ্ঞানিক নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলো এখনো বেশ পিছিয়ে আছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও নিরাপত্তার প্রস্তুতির মধ্যে বিশাল একটি ফাঁক রয়ে গেছে।

তবে এই কৃত্রিম ভাইরাসগুলো মানুষের শরীরের কোনো ক্ষতি করতে পারে না, কারণ এগুলো ফাই এক্স-১৭৪-এর ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছে—যা কেবল ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের ব্যাকটেরিওফাজ বলা হয়। ঝুঁকি এড়াতে বিজ্ঞানীরা ইভোকে কেবল মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন সব ব্যাকটেরিওফাজের তথ্য দিয়েই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এআই সৃষ্ট এসব ভাইরাস জিন থেরাপিসহ নানা চিকিৎসায় কাজে আসতে পারে বলেও গবেষণায় আশা প্রকাশ করা হয়েছে।