২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথমার্ধেই উসমান দেম্বেলের বিভীষিকাময় পারফরম্যান্স দেখে বিরতির আগেই তাঁকে বদলি করে দেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম। দেম্বেলের ফাউলে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়, বিরতির আগেই ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০। ড্রেসিংরুমে দেশম ক্ষোভে ফুঁসে বলেন, ‘তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে না ফাইনালে খেলছ!’ কিলিয়ান এমবাপ্পেও হতাশ হয়ে সতীর্থদের বলেন, ‘এসব কী করছ! বিশ্বকাপ প্রতি চার বছরে একবার আসে।’ কোণায় বসে সব শুনে যাওয়া ছাড়া দেম্বেলের তখন কিছুই করার ছিল না। পরদিন ফরাসি দৈনিক লেকিপ তাঁর পারফরম্যান্সকে দশের মধ্যে শূন্য দিয়ে শিরোনাম করে ‘দেম্বেলে, মহাবিপর্যয়’। বিশেষজ্ঞ গ্যারি নেভিল মন্তব্য করেন, ‘ও তো ছোট বাচ্চাদের মতো খেলল!’ সেদিনের স্মৃতি মনে করে গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে দেম্বেলে জানান, ‘পরের দিন সকালে মনে হচ্ছিল, ফুটবল খেলা আর কখনো দেখতে পারব না।’ তাঁর মনে সংশয় জেগেছিল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেছে কি না।
সময়ের ব্যবধান সাড়ে তিন বছর। স্পেনের বিপক্ষে আজ বিশ্বকাপের আরেকটি সেমিফাইনালে নামছেন দেম্বেলে। এখন তিনি দুবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বিজয়ী ও ব্যালন ডি’অর জয়ী ফুটবলার। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণের অপরিহার্য অংশ তিনি—ছয় ম্যাচে পাঁচ গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট তাঁর। ডিসেম্বরে আরও একটি ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা সামনে। তাঁর প্রত্যাবর্তনকে রাজকীয় বলাই যায়। তিনি এখন ভারমুক্ত, দলের অগাধ আস্থা ও নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন, খেলেন সতীর্থদের জন্য।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেম্বেলে ও এমবাপ্পের দ্বন্দ্বের গুঞ্জন ছিল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা উড়ে গেছে। এমবাপ্পের পাস থেকে দেম্বেলে গোল করেছেন, দেম্বেলেও এমবাপ্পের জন্য পাস বাড়িয়েছেন। প্রথম ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে গোল না পেয়ে সমালোচিত হলে অধিনায়ক এমবাপ্পেই দাঁড়িয়েছেন দেম্বেলের পাশে। বড় টুর্নামেন্টে ১৯ ম্যাচ গোলশূন্য থাকা দেম্বেলেকে নিয়ে এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘আক্রমণভাগে আমাদের চারজনের মধ্যে দেম্বেলেই সেরা। ও খারাপ খেলেছে—এমন কথার সঙ্গে আমি একমত নই।’ স্প্যানিশ ম্যাগাজিন দোন বালোন দেম্বেলেকে ‘বিষণ্ন, উদাসীন ও অতিরিক্ত স্বার্থপর’ আখ্যা দিয়েছিল। আর্জেন্টাইন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি বলেছিলেন, ‘অন্যদের ভালো খেলানোর ক্ষমতা তার নেই, সে কেবল নিজে একা জ্বলে উঠতে জানে।’ কিন্তু বর্তমানে ফ্রান্স বা পিএসজির দিকে তাকালে দেখা যায়, সতীর্থদের সেরাটা বের করে আনায় দেম্বেলের জুড়ি মেলা ভার। এমবাপ্পে ও ওলিসের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলের সবচেয়ে ভালো আসনটিও এখন তাঁর।
দেম্বেলে আগের মতোই কিছুটা অলস, আড্ডাবাজ ও রসিক। তাঁর দেওয়া ‘মবুতু’ ডাকনাম থেকেই এমবাপ্পের ‘স্বৈরাচার’ মিমস ছড়িয়ে পড়েছে। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে দেম্বেলে এখন দলকে টেনে নিতে পারেন সতীর্থদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সাড়ে তিন বছর আগের সেই ‘ছোট্ট ছেলেটা’ এখন এতটাই বড় যে এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের একমাত্র হ্যাটট্রিকটি তাঁর। আজ সেমিফাইনালে এমবাপ্পে–ওলিসদের মতো দেম্বেলেকেও ঘিরে প্রত্যাশা থাকবে। ফ্রান্স কোচ অবশ্য স্পেনকে ফেবারিট বলেছেন।



