কুমিল্লা নগরের জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের হাঁটু-কোমর পানি মাড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করে। ১৩ জুলাই টানা বর্ষণে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, যা নগরবাসীর কাছে নতুন নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নগরের পানি অপসারণের প্রধান মাধ্যম কান্দি খাল দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল গুঙ্গাইজুড়ি খাল হয়ে ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে মিশত, কিন্তু বর্তমানে এটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। খালের ওপর ছোট কালভার্ট, স্টিলের সেতু, পাইপলাইন ও স্থায়ী দখল মিলিয়ে পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু) জানান, পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো স্থাপনা রাখা হবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যে কেউ আইন লঙ্ঘন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হয়েছে। যারা নিজ দায়িত্বে কালভার্টসহ স্থাপনা সরাবে না, সেগুলো সিটি করপোরেশন ভেঙে দেবে। খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সরেজমিনে নগরের সালাউদ্দিন মোড় থেকে নোয়াগাঁও চৌমুহনী পর্যন্ত দেখা গেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ খালের পাড়ে অসংখ্য ব্যক্তি যাতায়াতের সুবিধার জন্য ছোট ছোট কালভার্ট নির্মাণ করেছেন। বহুতল ভবনের অংশ খালের ভেতরে চলে গেছে, আর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীর খালের জায়গা দখল করে রেখেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কার্যালয়, আইইবিসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সামনে খালের প্রস্থের তুলনায় অনেক ছোট কালভার্ট নির্মাণ করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিমত, কান্দি খালের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত আসে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের সময়। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে টমছম ব্রিজ এলাকা থেকে পদুয়ার বাজার পর্যন্ত দুই লেনের সড়ক চার লেন করতে গিয়ে সওজ কান্দি খালের প্রায় অর্ধেক সংকুচিত করে ফেলে। সে সময় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু এই ভরাট আটকাতে পারেননি। চার লেন প্রকল্পের কাজের পর থেকেই নগরে জলাবদ্ধতার তীব্রতা বেড়েছে।
জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান কান্দি খালের কোনো সম্পত্তি দখল করেনি। অন্যদিকে কুমিল্লার ইতিহাস-গবেষক আহসানুল কবীর জানান, তিন দশক আগেও নগরে এমন জলাবদ্ধতা ছিল না। ৮০ ফুটের বেশি প্রস্থের খাল ১০-১৫ ফুটের নালায় পরিণত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগর তলিয়ে যায়। প্রশাসক মোল্লা পুনরায় জানান, সরকারি বা ব্যক্তি—সবাইকে আইন মানতে হবে এবং খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




