টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সৃষ্ট বন্যায় বান্দরবানের কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। সদর উপজেলার রেইছা সদর ইউনিয়নের গোয়ালিয়াখোলার মনিরাপাড়া, যা জেলার অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদন কেন্দ্র, সেখানকার চাষিদের প্রায় সব ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, জেলার সাতটি উপজেলায় ৫ হাজার ৭৩৬ একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৮৩৭ একর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ৮ হাজার ১৬৯টি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সার্বিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

ইয়াসমিন আক্তার (৩৫) নামের এক কৃষাণী প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৪০ শতক জমি ৮ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে করলা চাষ করেছিলেন। আবাদ ও রক্ষণাবেক্ষণে আরও ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করেন তিনি। ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় দুই লাখ টাকার করলা বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু বন্যার পানি টানা চার দিন জমিতে জমে থাকায় গাছ পচে সব আশা শেষ হয়ে যায়। হতাশা প্রকাশ করে ইয়াসমিন বলেন, ‘বন্যায় ফসল তো সব নষ্ট হয়ে গেছে, এখন ধারদেনার ৩০ হাজার টাকা কীভাবে শোধ করব, খাবই-বা কী, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

শুধু ইয়াসমিনই নন, গোয়ালিয়াখোলা ও রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাঠজুড়ে পচে পড়ে থাকা সবজি দেখতে পাওয়া যায় এবং কৃষকেরা সেসব জমি পরিষ্কারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মনিরাপাড়ার কৃষক মো. রুবেল জানান, বন্যায় তাঁর ফসল তো বটেই, এমনকি ঘরও ভেসে গেছে। বর্তমানে পরিবারসহ তিনি এক আত্মীয়ের পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একই গ্রামের রওশন আরা ও জেসমিন আক্তারের জমিও রক্ষা পায়নি। জেসমিন জানান, প্রায় ৬০ শতক জমিতে করলা, ঢ্যাঁড়স ও বরবটি লাগিয়েছিলেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যেই ফলন তোলার কথা থাকলেও তিন দিন পানিতে ডুবে থাকার ফলে পুরো খেত নষ্ট হয়ে গেছে।

গোয়ালিয়াখোলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনছুর আলী জানান, তাঁর ব্লকেই কমবেশি ৫৭০টি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত, যার মধ্যে প্রায় ১৫০টি পরিবারের ক্ষতি বেশি। এদের সিংহভাগই প্রান্তিক কৃষক, যারা জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করেন। ভাঙ্গামুরা, চেমিমুখসহ বিভিন্ন এলাকায় শুধু এই ব্লকেই প্রায় এক কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বান্দরবান সদরে, যেখানে ২ হাজার ৬০৪টি কৃষক পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এরপরই রয়েছে লামা (১ হাজার ৮৭২টি পরিবার), রোয়াংছড়ি (১ হাজার ২৬৮টি), থানচি (১ হাজার ২৮টি), আলীকদম (৬৩৫টি), নাইক্ষ্যংছড়ি (৫৬১টি) এবং রুমা (২০১টি পরিবার)।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন জানিয়েছেন, বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে আমনের বীজতলা, আউশের জুমচাষ, ফলের বাগান, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির পাশাপাশি আদা ও হলুদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, বন্যার পলি জমির উর্বরতা বাড়ায় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে কৃষকেরা পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবেন।