জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দুই চোখের দৃষ্টি হারানো মো. আমান উল্লাহ (২২) এখন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ চেয়েছেন। তিনি জানান, অনেকেই মনে করেন ভাতা পেলেই যথেষ্ট, কিন্তু তিনি শুধু ভাতা বা দানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চান না। তাঁর মতে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে প্রশিক্ষণ ও কাজ অত্যন্ত জরুরি।
আমান উল্লাহ রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ঠেকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা নজির আহমেদ (৭০) একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাঠ পরিবহনের কাজ করতেন, আর মা আমেনা বেগম (৫৮) গৃহিণী। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। আহত হিসেবে পাওয়া সহায়তা দিয়ে তিনি বাড়ির পাশে একটি মুদিদোকান খুলেছেন। এর আগে রাজমিস্ত্রি ও খেতের দিনমজুরের কাজ করে তিনি ২০২৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত নিজের খরচ চালিয়েছিলেন। তিনি লংগদু মডেল ডিগ্রি কলেজের ছাত্র ছিলেন, কিন্তু ওই বছর পাস করতে পারেননি। টাকার অভাবে পরের বছর পরীক্ষার ফরম পূরণ করা সম্ভব হয়নি। জুলাইয়ে আহত হওয়ার কয়েক মাস আগে তিনি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা এলাকার একটি হোটেলে ব্যবস্থাপক হিসেবে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ নিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ২ আগস্ট তিনি জুলাই গণ-আন্দোলনে যোগ দেন। পরদিন চট্টগ্রামের জিইসি মোড় এলাকায় তাঁর পায়ে রাবার বুলেট লাগে। ৪ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকায় পুলিশের মারধরের শিকার হন তিনি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের খবর পেয়ে তিনি আনন্দমিছিলে অংশ নেন। আন্দরকিল্লা ও কাজীর দেউড়ি হয়ে নিউমার্কেট পর্যন্ত যান। সেখানে লালদিঘির ময়দান হয়ে জেলখানার মোড়ে এলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছুড়তে থাকে। আমান উল্লাহ জানান, তাঁর পাশে থাকা এক ছেলে মাথায় গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। তাঁর পিঠে ছররা গুলি লাগে। ফিরে তাকাতেই একজন পুলিশ তাঁকে গুলি করে। তিনি শুধু শব্দ পান এবং বুঝতে পারেন, তিনি চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। চোখ থেকে রক্ত পড়ছিল।
আহত অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, এক ছেলে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। তিনি ছেলেটির হাতে নিজের মুঠোফোন দিয়ে বলেন, ‘আমার কিছু হয়ে গেলে বাড়িতে জানিয়ে দিয়েন।’ ছেলেটি তখন কাঁদছিল। এখন পর্যন্ত তাঁর দুই চোখে নয়টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। দুই চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি সবকিছু আবছা দেখেন। বাঁ চোখে ঝাপসা, ডান চোখে শুধু মানুষের নড়াচড়া ও অবয়ব বুঝতে পারেন। পরিচিত পরিবেশে নিজে চলাফেরা করতে পারেন, কিন্তু বাইরে কারও সহায়তা ছাড়া চলতে পারেন না। বাইরে বের হলে হাতে সাদাছড়ি নিতে হয়।
চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (চিটাগাং আই ইনফারমারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্স) বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচারসহ চিকিৎসা পাচ্ছেন তিনি। সর্বশেষ গত ২ জুন অস্ত্রোপচার হয়েছে। হাসপাতালটির সার্জিক্যাল রেটিনা বিভাগের প্রধান সহযোগী পরামর্শক অপরাজিতা রায়হান জানান, আমান উল্লাহ ‘গানশট ইনজুরি’ নিয়ে এসেছিলেন। রেটিনায় ক্ষত বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ঠিক হয় না। প্রথমে তিনি একেবারেই দেখতে পেতেন না। কয়েক দফা অস্ত্রোপচারের পর এক চোখে একটু আলোর ঝলক পান। তবে দৃষ্টিহীনতার সংজ্ঞা অনুসারে তিনি দৃষ্টিহীন।
অতি গুরুতর আহত ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে মাসে ২০ হাজার টাকা করে সরকারি সম্মানী ভাতা পান তিনি। তবে জুলাই কার্ড সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যকর না হওয়ায় সমস্যায় পড়েন। অনেক জায়গায় এই কার্ড চিনতে পারেন না, বুঝতে পারেন না এর কাজ কী। আমান উল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, ‘অনেকে ভাবে, আমরা চোখে দেখি না, দানের ওপর চলব। প্রশিক্ষণ নিয়ে কী করবে? এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, দেশের সব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর প্রতি মানুষ ও সরকারের মনোভাব এমন।’
বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর গাজীপুরের টঙ্গীতে জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছয় মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আশা করছেন, এই প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো মানুষই তাঁর শতভাগ দিয়ে কাজ করতে পারে না। সীমাবদ্ধতা প্রত্যেকেরই আছে। তাই সরকার আমার মতো দৃষ্টিহীনদের উৎপাদনমুখী করতে বিশেষ নজর দিক।’




