বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সম্প্রতি পরিচালিত একটি গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরই হামের টিকা নেওয়া হয়নি। এই গবেষণা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত চালানো হয়। এতে অংশ নেয় ৩৪১ জন শিশু, যাদের বয়স ১৪ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গবেষক দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং শিশু হাসপাতালের ১৯ জন বিশেষজ্ঞ। গত রোববার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের আয়োজনে এই সেমিনারে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের নিচে। অপর এক অনুসন্ধানে আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানান, হামে মৃত ৩৩৭ শিশুর মধ্যে ৯১ শতাংশই কোনো টিকা পায়নি। তাদের মধ্যে ২২ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম, ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে এবং ২৫ শতাংশের বয়স ৯ থেকে ১১ মাস। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশু ছিল ১৭ শতাংশ, আর ৫ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি বয়সী ছিল মাত্র ৬ শতাংশ।
মোস্তাফিজুর রহমান ব্যাখ্যা করেন, হামের টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়সের ওপর নির্ভর করে। ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে টিকা দিলে মাত্র ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিশুর শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। অন্যদিকে, ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে এই হার বেড়ে যায় এবং ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু সুরক্ষিত থাকে। টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৪৩ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম হওয়ায় টিকা দেওয়ার সময় হয়নি। বাকি ৩৭ শতাংশ শিশু ৯ মাসের বেশি বয়স হওয়া সত্ত্বেও কোনো টিকা পায়নি। মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু এক ডোজ টিকা পেয়েছিল, আর মাত্র ৬ শতাংশ দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন করেছিল।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া দেখা দেয়, যা মৃত্যুর কারণ হয়। তিনি বলেন, টিকার পাশাপাশি পুষ্টি এবং মায়ের বুকের দুধ শিশুকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, লাইফ সায়েন্স অনুষদের সহকারী ডিন অপর্ণা ইসলাম ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান নাদিয়া সুলতানা।
গবেষকরা হাম, টিকার কার্যকারিতা এবং শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। মোস্তাফিজুর রহমান গর্ভবতী মায়েদের হামের টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, হামের টিকাদান কর্মসূচি আরও ১০ মাস আগে শুরু করা গেলে বর্তমান প্রাদুর্ভাব এত তীব্র হতো না।
এদিকে, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের উপসর্গে মোট ৬৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৯৫ শিশু। অর্থাৎ একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৮৮টি শিশু মারা গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আরও ৪ শিশু হামের উপসর্গে মারা গেছে এবং ৯৩৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ১১৩টি শিশুর মধ্যে।




