ঢাকার ধানমন্ডির অর্চার্ড পয়েন্টের তৃতীয় তলায় ১৮ জুলাই শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে চামড়াজাত পণ্যের ব্র্যান্ড শাবাব লেদারের নতুন শোরুম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিল অতিথিদের শুভেচ্ছা, নতুন পণ্যের প্রদর্শনী ও উৎসবমুখর পরিবেশ। এই শোরুম চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, যা শুধু আরেকটি শোরুম খোলার গল্প নয় বরং একজন নারী উদ্যোক্তার স্বপ্নযাত্রার মাইলফলক।
২০১৪ সালে হাতে মাত্র কয়েকটি চামড়াজাত পণ্য ও নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করেন প্রতিষ্ঠাতা মাকসুদা খাতুন। বর্তমানে শাবাব লেদার ওয়ালেট, বেল্ট, জ্যাকেট, ট্রাভেল ব্যাগ, নারীদের হ্যান্ডব্যাগ ও করপোরেট গিফটসহ নানা ধরনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের ১১টি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে, যা তাদের সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন।
মাকসুদা খাতুনের মতে, রপ্তানির সংখ্যার চেয়েও বড় অর্জন হলো ক্রেতাদের আস্থা অর্জন। তিনি বলেন, মানুষ একবার তাদের পণ্য ব্যবহার করলে বারবার ফিরে আসেন এবং এই আস্থাই প্রতিদিন নতুন করে কাজ করার সাহস যোগায়। দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতাদের অনুরোধ ছিল শহরের কেন্দ্রে একটি শোরুম থাকা প্রয়োজন, কারণ ব্যস্ত নগরজীবনে হাজারীবাগে গিয়ে কেনাকাটা সব সময় সহজ হয় না। সেই চাহিদা পূরণ করতেই ধানমন্ডিতে এই শোরুম চালু করা হয়েছে।
নতুন শোরুম উদ্বোধন উপলক্ষে পুরো জুলাই মাসজুড়ে সব পণ্যে ১৫ শতাংশ মূল্যছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। মাকসুদা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। তাঁর ভাষ্য, তৈরি পোশাক শিল্পের মতো কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয় না বরং দেশের নিজস্ব সম্পদ, দক্ষ কারিগর ও সৃজনশীল নকশার সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসিক প্রতিবন্ধকতা। তিনি জানান, ব্যবসার চেয়েও কঠিন ছিল মানুষকে বোঝানো যে একজন নারী নিজের যোগ্যতায় একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। দুই সন্তানের মা হিসেবে সংসার ও ব্যবসা একসঙ্গে সামলাতে কখনো ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, কখনো দিন-রাত কাজ করেছেন নতুন ক্রেতা খুঁজতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হাসিমুখের ছবি দেখেই অনেকে নারী উদ্যোক্তাদের জীবন আরামদায়ক মনে করলেও তিনি বলেন, ছবির পেছনের পরিশ্রম কেউ দেখে না।
আগামী আগস্টে ১২ বছরে পা দেবে শাবাব লেদার। মাকসুদা বলেন, প্রতিটি নতুন শুরুই তাঁর কাছে আনন্দের—নতুন কারখানা, নতুন পণ্য, নতুন রপ্তানি বাজার কিংবা ধানমন্ডির এই শোরুম সবই একই স্বপ্নের নতুন অধ্যায়। তাঁর অপূর্ণ স্বপ্ন হলো শাবাব লেদারকে এমন একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করা যার নাম আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ—অন্যকে নকল না করে নিজের শক্তি খুঁজে বের করা, গবেষণা করা ও ধৈর্য ধরে লেগে থাকা।
ধানমন্ডির নতুন শোরুমের কাচের দরজা দিয়ে প্রতিদিন আসা ক্রেতারা হয়তো একটি ওয়ালেট বা ব্যাগ কিনবেন, কিন্তু প্রতিটি পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকবে একজন নারীর নিরলস পরিশ্রম ও নিজের স্বপ্নকে হার না মানার ইতিহাস। হাজারীবাগের ছোট উদ্যোগ থেকে বিশ্বের ১১ দেশে পৌঁছে যাওয়া শাবাব লেদারের যাত্রা প্রমাণ করে, একটি ব্র্যান্ড বড় হয় মানুষের বিশ্বাস, সততা ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের মাধ্যমে।




