দেশের জীবনবিমা খাতে ইতিহাস গড়ে বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো কোনো স্থানীয় কোম্পানি অধিগ্রহণ করল। শ্রীলঙ্কার জীবনবিমা কোম্পানি সফটলজিক লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসি বাংলাদেশের ডায়মন্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের ৬০ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে। এই লেনদেনের মাধ্যমে সফটলজিক বাংলাদেশের তৃতীয় বিদেশি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হলো, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ ও ভারতের এলআইসি এ দেশে কার্যক্রম শুরু করেছিল।

রোববার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) জানায়, তারা ডায়মন্ড লাইফের ৬০ শতাংশ শেয়ার কেনার ব্যাপারে সফটলজিককে অনুমোদন দিয়েছে। আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার সফটলজিককে ডায়মন্ড লাইফের ৬০ শতাংশ শেয়ার কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইফতেখার আহমেদ, যিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন, প্রথম আলোকে জানান, শেয়ার কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা বাংলাদেশের জীবনবিমা খাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চান।

জানা যায়, এই অধিগ্রহণ শুধুমাত্র আর্থিক বিনিয়োগ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বাজারে কাজ করতে চায় সফটলজিক। শ্রীলঙ্কায় স্বাস্থ্যবিমা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও গ্রাহককেন্দ্রিক কার্যক্রমে তাদের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে দাবি ব্যবস্থাপনায় সময় কমানো, কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া হ্রাস করা এবং আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্রমতে, গত এক দশকে সফটলজিক লাইফ শ্রীলঙ্কার দ্রুত বর্ধনশীল জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশটির জীবনবিমা শিল্পের গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ হলেও সফটলজিকের প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি ২৬ শতাংশ। গত চার বছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রিমিয়াম আয়, কর-পূর্ব মুনাফা, কর-পরবর্তী মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে ৩০ শতাংশের বেশি মূলধনের বিপরীতে মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা। আরও জানা যায়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমাপ্রতিষ্ঠান অ্যালিয়াঞ্জের স্থানীয় জীবনবিমা কোম্পানি অ্যালিয়াঞ্জ লাইফ ইনস্যুরেন্স লঙ্কাকেও অধিগ্রহণ করেছে সফটলজিক। এছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান নরফান্ড ও ওপি ফিনফান্ড প্রতিষ্ঠানটিতে কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে।

২০১৪ সালে কার্যক্রম শুরু করা ডায়মন্ড লাইফের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১৮ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, ডায়মন্ড লাইফের ৬০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১৯ লাখ মার্কিন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩ কোটি টাকার বেশি। ডায়মন্ড লাইফের চেয়ারম্যান রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, দেড় বছর ধরে আলোচনার পর দুই সপ্তাহ আগে শেয়ার কেনাবেচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কোম্পানিটি ইতিমধ্যে তাদের মতো করে পরিচালনা শুরু করেছে। কেন বিক্রি হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কার কোম্পানিটি ভালো এবং তারা অন্য ব্যবসায় মনোযোগী।

ডায়মন্ড লাইফের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনসংখ্যার তুলনায় জীবনবিমা খাতের প্রসার এখনো সীমিত। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার, আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এ খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সফটলজিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশের গ্রাহকদের প্রয়োজনে নতুন বিমা পণ্য, শক্তিশালী বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং করপোরেট সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেবে বলে আইডিআরএকে জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কায় অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জীবনবিমা খাতে গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে তারা। সফটলজিক মনে করে, শৃঙ্খলাপূর্ণ কার্যক্রম, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও তারা দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম।