বিশ্ব আইসক্রিম দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের আইসক্রিম শিল্পের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। জুলাই মাসের তৃতীয় রোববার পালিত এই দিবসটি এবার দেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে যেমন বাজারের আকার বেড়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে ভোক্তার স্বাদ ও চাহিদার বৈচিত্র্য। এই খাত এখন আর শুধু শিশুদের জন্য শীতল আনন্দ নয়; বরং হাজার কোটি টাকার করপোরেট প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে।

আবহাওয়ার পরিবর্তন এই শিল্পের অন্যতম বড় অনুঘটক। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশে গ্রীষ্মকাল ও তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক দশক আগেও আইসক্রিমের মূল মৌসুম ছিল মার্চ থেকে জুন, এখন তা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দীর্ঘায়িত গ্রীষ্মের ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ চক্র প্রায় সারা বছরই সক্রিয় থাকে, যা বিক্রিতে নতুন রেকর্ড তৈরি করছে।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনাল ও লাইটহাউস বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের আইসক্রিমের বাজার বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। মার্কএনটেলের এক গবেষণায় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে ২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত এই বাজার গড়ে ৯ শতাংশের বেশি হারে বাড়বে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যয় বেড়েছে, যা আইসক্রিমের চাহিদাকে চাঙ্গা করেছে।

শুধু আকারে দ্বিগুণ নয়, এই পাঁচ বছরে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ব্যবহারেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। পোলার, সেভয়, ইগলু, জা এন জি ও লাভেলোর মতো শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ময়মনসিংহের ভালুকা, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অটোমেটেড কারখানা, যার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা লাখ লাখ লিটার। একসময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও বর্তমানে দেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে কারখানাগুলো পুরোপুরি সক্ষম। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এখন উঠেছে রীতিমতো করপোরেট লড়াই।

ভোক্তাদের রুচির পরিবর্তনও প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সাধারণ ভ্যানিলা বা স্ট্রবেরি স্বাদে সন্তুষ্ট না থেকে তরুণ প্রজন্ম এখন খুঁজছে নতুন স্বাদের অভিজ্ঞতা। এর জেরে বাজারে এসেছে প্রিমিয়াম ও ফিউশন স্বাদের পণ্য। সম্প্রতি বাজারে আসা 'রোবাস্তো পিস্তা কুনাফা' বা 'বেলজিয়াম ডার্ক চকলেট'-এর মতো উদ্ভাবনী পণ্য তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সুপারশপ থেকে পাড়ার দোকান—সবখানেই প্রিমিয়াম আইসক্রিমের জন্য আলাদা জায়গা রাখা হচ্ছে। কম দামি পণ্যের তুলনায় এসব পণ্যে মুনাফার মার্জিন বেশি থাকায় কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।

তবে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও নানা চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। ইগলুর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জি এম কামরুল হাসান জানান, বাজারের আকার বাড়লেও কাঁচামালের সংকট প্রকট। আইসক্রিম উৎপাদনের মূল উপকরণ—স্কিমড মিল্ক পাউডার, বাটার ফ্যাট, কোকোয়া ও বিশেষ ফ্লেভার—প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি বাজেটে এই কাঁচামালের উপর শুল্ক ও কর বাড়ানো এবং ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি মনে করেন, সরকারের নীতিগত সহায়তা পেলে দেশি শিল্প আরও প্রসার লাভ করতে পারে।

এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোল্ড চেইন লজিস্টিকস। আইসক্রিমকে কারখানা থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকা এবং তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে কোল্ড চেইন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে খুচরা বিক্রেতাদের ফ্রিজার চালানোর ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক সময় পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কামরুল হাসানের মতে, গ্রীষ্মকালে আইসক্রিমের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে, কিন্তু সে সময় লোডশেডিংও বেশি থাকে, যা এই শিল্পের জন্য বড় বাধা। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ আরও বেড়েছে। দেশের নগরায়ণ ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও কোল্ড চেইনের সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি।