নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিন্নমত দমনের অভিযোগে পুলিশি তৎপরতা এবং এক তরুণের আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত সপ্তাহান্তে বন্যায় বিপর্যস্ত বস্তিবাসীদের প্রতি সমর্থন জানাতে গিয়ে জেন–জি আন্দোলনের তিন সক্রিয় কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন আইনজীবী মজিদ আনসারি, সারিশমা থাপা ও নেলসন ঘাটানি। ভারী বর্ষণের কারণে কীর্তিপুর শহরের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্লাবিত হলে তাঁরা সেখানে গিয়ে ভুক্তভোগীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের দাবি তোলেন।
আনসারির অভিযোগ, আশ্রয়কেন্দ্রের প্রবেশপথেই পুলিশ তাঁকে মারধর করে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলে কোনো কাগজপত্র না দেখিয়ে বরং কর্মকর্তারা তাঁকে অপমান করেন এবং ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি না করার হুমকি দেন। থাপা ও ঘাটানিকে গালাগাল দিয়ে জোরপূর্বক ভ্যানে তোলা হয়। থাপা জানান, পরে ভবিষ্যতে অনুরূপ কর্মকাণ্ডে অংশ না নেওয়ার অঙ্গীকারনামা লিখিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, আনসারিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য টিচিং হাসপাতালে নেওয়া হলেও পুলিশ সেখানেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাতে থাকে। একই দিনে রাত সাড়ে ৯টায় অবস্থান ধর্মঘট করা বিক্ষোভকারীদেরও রোববার একই শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। মোরাং জেলা পুলিশপ্রধান এসপি কবিত কাটাওয়াল দাবি করেন, পুলিশ সদর দপ্তরের মূল ফটক অবরোধ এবং পুলিশি কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরির কারণেই এই গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।
এদিকে ঝাপা জেলা থেকে কাঠমান্ডুতে প্রত্যাবর্তনের পর রোববার ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অধিকারকর্মী দুর্গা প্রসাইকে আটক করে পুলিশ। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করতে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল তাঁর। পুলিশের ভাষ্য, প্রসাই একটি সংরক্ষিত এলাকায় বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশকে দিন দিন নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে গণ্য করছে পুলিশ।
সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের এই ধারা সম্প্রতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। গত ১১ এপ্রিল পঞ্চথড়ে ইউটিউবার রওশন পোখরেলকে গ্রেপ্তার করা হয় প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহকে নিয়ে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে। সাইবার ব্যুরোর অনুরোধে এই গ্রেপ্তার হলেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে তাঁকে পরিবারের জিম্মায় ছাড়া হয়। পরবর্তীতে আদালত ইলেকট্রনিক ট্রানজেকশন অ্যাক্টের মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় এবং জেলা জজ কুমার মাস্কে ২ জুলাই তাঁর আটকাদেশ বহাল রাখেন। ৭ জুলাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশা মেহতার ছবির ওপর লাল ক্রস এঁকে ‘মাফিয়া মন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ দাবি করায় স্বাস্থ্যকর্মী নাবেশ অধিকারীকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরদিনই মুক্তি দেওয়া হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য কপিল শ্রেষ্ঠর মতে, এসব গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে জনগণকে বোঝানো হচ্ছে যে সরকারের সমালোচনা করলে কেউ নিরাপদ থাকবে না। মানবাধিকারকর্মী শোভাকর বুধাতোকি বলেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা। তবে নেপাল পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে আপত্তিকর পোস্টের অভিযোগ পেলেই সাইবার ব্যুরো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাবেক ডিআইজি হেমন্ত মল্ল সতর্ক করে বলেন, কেবল প্রশ্ন তোলা বা সমালোচনার জন্য গ্রেপ্তার, তদন্ত বা মামলা করা যায় না। সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ বাড়ায় সম্মুখসারির পুলিশ সদস্যদের আচরণ আরও সংবেদনশীল হওয়া জরুরি।
অপর একটি ঘটনায়, রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট কার্যালয়ের সামনে গত বৃহস্পতিবার রাইড শেয়ারিং চালক গণেশ নেপালি নামের ২৫ বছর বয়সী এক তরুণের আত্মাহুতির ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভের জন্ম দেয়। মোটরসাইকেল পার্কিং নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে তিনি নিজের বাইক থেকে পেট্রোল ঢেলে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ দ্রুত আগুন নেভালেও গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় শুক্রবার ভোরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। কাঠমান্ডু মহানগর পুলিশ এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের সময় দুঃখজনক দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করেছে। এই মৃত্যুর প্রতিবাদে সংসদ থেকে রাজপথ সর্বত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভকারীরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। জনতার প্রচণ্ড চাপের মুখে সরকার পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ছাত্র নেতা দীপক ধামি বলেন, জনমানুষের অবস্থা বুঝতে যাওয়া সক্রিয়কর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর বলপ্রয়োগ দুর্ভাগ্যজনক। পুলিশের মুখপাত্র ডিআইজি আবি নারায়ণ কাফেলের দাবি, শুধুমাত্র পুলিশি কাজে বাধাদানকারী বা জননিরাপত্তা বিঘ্নকারীদের বিরুদ্ধেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।


