অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের উপকূলে ফরেস্ট বিচ নামক স্থানে সম্প্রতি এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে সমুদ্রের ঢেউ বয়ে নিয়ে আসে ছয়টি রহস্যজনক ধাতব নির্মিত গোলক। স্থানীয় বাসিন্দারা কৌতুকের ছলে এই বস্তুগুলোর নাম দেন 'স্পেস বল'। প্রাথমিক অবস্থায় এগুলোর প্রকৃতি ও উৎস নিয়ে তুমুল জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়।

পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সি (এএসএ) বিষয়টি স্পষ্ট করে। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই গোলকগুলো সম্ভবত প্রেশার ভেসেল বা চাপনিয়ন্ত্রক পাত্র। এগুলো অত্যন্ত মজবুত ধাতব নির্মাণ, যা উচ্চচাপে গ্যাস বা তরল সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। সংস্থাটির ধারণা, কোনো রকেট যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে, তখন এই অংশটি সেটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। আকারের দিক থেকে প্রতিটি গোলক প্রায় একটি বাস্কেটবলের দ্বিগুণ।

ঘটনার শুরুর দিকে মহাকাশ সংস্থাটি সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, এই বস্তুগুলোর কাছাকাছি যাওয়া উচিত হবে না। পরে কুইন্সল্যান্ডের জরুরি সেবা বিভাগের কর্মীরা সেগুলো স্থানান্তর করেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নিশ্চিত করেন যে আপাতদৃষ্টিতে এগুলো বিপজ্জনক নয়। তারপরও সংস্থাটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছে, আশপাশের এলাকায় আরও অনুরূপ ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে পারে। এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে পরিষ্কার ভাষায় বলেন, ‘মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ সন্দেহ হলে কখনোই তা স্পর্শ, স্থানান্তর বা নিজ উদ্যোগে উদ্ধারের চেষ্টা করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত সেটিকে বিপজ্জনক ভাবতে হবে। দ্রুত স্থান ত্যাগ করে জরুরি সেবায় খবর দিতে হবে।’

এদিকে, এই গোলকগুলোর সঠিক উৎস শনাক্তকরণে অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সি একাধিক আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো এগুলো ঠিক কোন মহাকাশযান বা রকেটের অংশ এবং কোন দেশ এটি নিক্ষেপ করেছিল, তা নির্ণয় করা। এই ঘটনা মহাকাশে ক্রমবর্ধমান আবর্জনার সমস্যাকেও সামনে নিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানা ধরনের বস্তু— যেমন নিষ্ক্রিয় কৃত্রিম উপগ্রহ, খালি জ্বালানি ট্যাংক, রকেটের বিচ্ছিন্নাংশ, এমনকি রঙের অতি ক্ষুদ্র কণাও— কক্ষপথে জমা হচ্ছে।

মহাকাশ অনুসন্ধান ও বাণিজ্যিক তৎপরতা গত কয়েক দশকে নাটকীয়ভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা কক্ষপথে থাকা বস্তুগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করেছেন, যেন সংঘর্ষ এড়ানো যায় এবং ভূপৃষ্ঠে ধ্বংসাবশেষ পতনের আশঙ্কা কমানো যায়। কিন্তু সমস্যা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে সামরিক বাহিনী প্রায় ২৩ হাজার টুকরো আবর্জনার উপর নজর রেখেছিল। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা ১০৪ শতাংশের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ হাজারে। তবে গবেষকদের ধারণা, এটি মোট আবর্জনার খুব সামান্য ভগ্নাংশ, কারণ অধিকাংশ টুকরোর আকার ১ মিলিমিটার থেকে ১০ সেন্টিমিটারের মধ্যে, যা শনাক্ত করা দুরূহ। নাসার হিসাবে, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে এ রকম কয়েক মিলিয়ন ছোট-বড় ধ্বংসাবশেষ পরিভ্রমণ করছে।

পৃথিবীতে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনা বিরল হলেও একেবারে অজানা নয়। গত মার্চে নাসার একটি মহাকাশযান বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে; ধারণা ছিল তাপে তা পুড়ে ছাই হবে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ হয়নি। ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের নিকটবর্তী গ্রিন হেড সৈকতে প্রায় ১০ ফুট লম্বা একটি ধাতব সিলিন্ডার ভেসে আসে, যেটিকেও পরে রকেটের অংশ বলে সন্দেহ করা হয়। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের একটি ধ্বংসাবশেষ ফ্লোরিডার এক বাসভবনের ছাদ ফুঁড়ে ভেতরে ঢোকে, যা বায়ুমণ্ডলেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এসব ঘটনায় প্রাণহানির কোনো লিপিবদ্ধ ইতিহাস না থাকলেও আহত হওয়ার নজির আছে। ২০০২ সালে চীনের শানসি প্রদেশে এক ছয় বছর বয়সী শিশু রকেটের ধাতব খণ্ডের আঘাতে আহত হয়। এরও আগে ওকলাহোমার লোটি উইলিয়ামস নামের এক নারীর গায়ে মহাকাশের একটি ছোট টুকরো এসে লাগে, যিনি গিনেস রেকর্ড অনুযায়ী এমন ঘটনার প্রথম শিকার।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এই ঝুঁকি হ্রাসের প্রধান উপায় হলো কক্ষপথে সক্রিয় উপগ্রহ ও অন্যান্য নভোযানের মধ্যে সংঘাত প্রতিরোধ করা। অধিকাংশ ধ্বংসাবশেষ ঘণ্টায় প্রায় ২৯ হাজার কিলোমিটার বেগে ধাবিত হয়, যা একটি ছোড়া গুলির গতির তুলনায় প্রায় সাত গুণ। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬১ সাল থেকে অচল মহাকাশযান বা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ৬৫০টির বেশি সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে বিপুল পরিমাণ নতুন ধ্বংসাবশেষ সৃষ্টি হয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা এখনও অত্যন্ত নগণ্য, দ্য অ্যারোস্পেস করপোরেশনের মতে যা এক ট্রিলিয়নে একেরও কম। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই সমস্যা সমাধানে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। স্পেসএক্স পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি করছে যাতে অংশগুলো আবর্জনা না হয়ে পুনরায় কাজে লাগে। অ্যাস্ট্রোস্কেল নামের একটি সংস্থা এমন রোবোটিক বাহু নির্মাণ করছে যা কক্ষপথের অচল উপগ্রহ ধরে এনে নিরাপদে অপসারণ করতে পারবে।