ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, বিপদ-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নবী করিম (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দিতে গিয়ে একটি দেহের উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটি দেহের মতো। দেহের কোনো একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার সঙ্গে সাড়া দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১১) এই হাদিসটিই ইসলামে দুর্যোগ মোকাবিলার নীতিশাস্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বন্যা, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ বা মহামারি—যে নামেই বিপর্যয় আসুক, প্রশ্নটি একই: শরীরের বাকি অংশ কি সাড়া দেবে, নাকি নিস্তেজ থাকবে? অপরের সুখে সুখী হওয়া সহজ হলেও দুঃখ ভাগ করে নেওয়া অনেক বেশি কঠিন। এই কঠিন কাজটিকেই নবীজি মুমিনের পরিচয়ের অংশ করে দিয়েছেন।

হাদিসবিশারদগণ ওই একটি হাদিসের মধ্যে কাছাকাছি অর্থের তিনটি শব্দ চিহ্নিত করেছেন: ‘তারাহুম’, ‘তাওয়াদ’ ও ‘তাআতুফ’। ‘তারাহুম’ অর্থ হলো ইমানি ভ্রাতৃত্বের টানে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে একে অপরের প্রতি দয়া-মায়া প্রদর্শন। ‘তাওয়াদ’ হলো এমন আচরণ যা অন্তরে স্থায়ী ভালোবাসার সঞ্চার করে, যেমন খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং উপহার বিনিময়। আর ‘তাআতুফ’ হলো গভীর মায়ার সঙ্গে বস্তুগত সাহায্য করা এবং বিপদের সময় পরম আশ্রয় হয়ে ওঠা। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি ফি শারহি সহিহিল বুখারি, ১০/৫৪০) এই তিনটি শব্দ মিলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা হলো—সমবেদনা কেবল অনুভূতির স্তরে থেমে থাকে না, বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নেয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সফলকাম ও পুণ্যবানদের পরিচয় দিতে গিয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান করা এতিম নিকটাত্মীয়কে, অথবা ধূলি-ধূসরিত মিসকিনকে।’ (সুরা বালাদ, আয়াত: ১৪-১৬) এখানে সাধারণ দানের কথা বলা হয়নি, বরং ‘দুর্ভিক্ষের দিনে’ দানের কথা বলা হয়েছে, যখন নিজের হাতেও অভাব থাকে। প্রাচুর্যের সময়ের দান আর সংকটের সময়ের দান সমান নয় বলেই এই নির্দেশনা। এ বিষয়টিরই সম্প্রসারণ দেখা যায় নবীজির আরেকটি বাণীতে, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪১) তাফসিরকারগণ সুরা বালাদের ওই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় এই হাদিসটি উদ্ধৃত করে থাকেন।

নবী করিম (সা.) নিজেও এই নীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। হোদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মানুষ খাদ্যের অভাবে চামড়া ও হাড় চিবিয়ে খাচ্ছিল। মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান, যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং যার নেতৃত্বে মুসলিমরা বছরের পর বছর নির্যাতিত হয়েছিল, তিনি মদিনায় এসে নবীজির কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। নবীজি (সা.) পুরোনো সব শত্রুতা ভুলে মক্কার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী ও খেজুরের ত্রাণ পাঠান, যা আবু সুফিয়ান ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার মাধ্যমে মক্কার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। জানা যায়, এই ত্রাণের পরিমাণ ছিল পাঁচশত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা), যেখানে এক দিনারে একটি বকরি কেনা যেত। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৮/২৩৩) এখানে সাহায্যপ্রাপ্ত মানুষগুলো মিত্র, আত্মীয় বা সহধর্মী ছিলেন না—বরং তারা ছিলেন সেই মানুষ, যাদের হাতে মুসলিমরা নির্যাতিত হয়েছিল। ‘এক দেহ’-এর উপমাটি এখানে তার সর্বোচ্চ সীমায় পরীক্ষিত হয়। সমবেদনা যদি শুধু নিজের গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা নীতি নয়, বরং নিছক গোত্রপ্রীতি। নবীজির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, ইসলামে মানবিক সাহায্যের ভিত্তি ধর্ম-পরিচয় নয়, বরং মানুষের কষ্ট।

প্রতি প্রজন্মের সামনে এই একই পরীক্ষা নতুন রূপে হাজির হয়—কখনো বন্যা, কখনো ভূমিকম্প, কখনো মহামারি বা দুর্ভিক্ষ রূপে। এখন প্রশ্ন হলো, শরীরের বাকি অংশ কি সাড়া দিচ্ছে? আমরা কি একটি শুকনো খাবারের প্যাকেট, এক বোতল বিশুদ্ধ পানি বা সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য অর্থ নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছি? আমাদের প্রত্যেকের এই সাড়া হয়তো ছোট, কিন্তু ‘এক দেহ’-এর উপমায় কোনো অংশই ‘ছোট’ থাকে না। জ্বর পুরো শরীরেই ছড়ায়, শুধু আক্রান্ত অঙ্গে নয়। এই বোঝাপড়া থেকেই বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। আমাদের এই চেষ্টা আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম হবে নিশ্চয়ই।