চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজ বর্তমানে তীব্র শিক্ষক ও জনবলসংকটে জর্জরিত। প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের ৪২টি পদের মধ্যে ২১টিই শূন্য। রসায়ন, দর্শন ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। ফলে নিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

১৯৩৮ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সহযোগিতায় ১৩ দশমিক ৬৯ একর জমির ওপর কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে এটি সরকারি করা হয়। একসময় রাজশাহী কলেজের পর বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের দ্বিতীয় প্রাচীন কলেজ হিসেবে পরিচিত ছিল এটি। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষক ও কর্মচারীর অভাবে কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২৬। অন্যদিকে ইংরেজি, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। অনার্সের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৭৫০। তবে এখানে কোনো বিষয়ে মাস্টার্স নেই।

সম্প্রতি রসায়ন বিভাগের তিন শিক্ষকের বদলি হলে বিভাগটিতে শিক্ষকের সংখ্যা শূন্যে দাঁড়ায়। এতে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি (পাস) কোর্সের রসায়নের পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ মো. মোজাহারুল ইসলাম এ অবস্থায় নিজেকে অসহায় বোধ করছেন। তিনি জানান, চরম শিক্ষক সংকট থাকার পরেও কেন বদলি করা হচ্ছে তা তাঁর বোধগম্য নয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সোহেল রানা জানান, রসায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকা চরম বৈষম্য। যিনি একমাত্র শিক্ষক ছিলেন তাকেও সরিয়ে নেওয়ায় তাঁরা পড়ালেখার অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। অপরদিকে দর্শন বিভাগেও একই চিত্র। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ওই বিভাগে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। একজন অতিথি শিক্ষকের ওপর ভরসা করে চলছে ক্লাস। দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মামুনুর রশিদ জানান, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অর্ধেকই শেষ বর্ষে এসে ঝরে পড়ছে। লেখাপড়া নিয়ে তাঁরা চরম হতাশায় রয়েছেন।

অতিথি শিক্ষক হিসেবে দর্শনের ক্লাস নিচ্ছেন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে রাজশাহীতে বসবাস করেন। রাজশাহী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সপ্তাহে এক-দুই দিন তিনি ক্লাস নিতে আসেন। তিনি বলেন, বর্তমান অধ্যক্ষের অনুরোধে কোনো সম্মানী ছাড়াই ক্লাস নিচ্ছেন। তবে তাঁর হাতেই দর্শন বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে মায়া পড়ে ক্লাস নিতে আসেন। কিন্তু এটি অনার্সের শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট নয় বলেও মত তার।

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও সহায়ক কর্মচারীর অভাবে কলেজের দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান সহকারী ও হিসাবরক্ষকের পদ শূন্য। একজন অফিস সহকারীকে প্রধান সহকারীর এবং কোষাধ্যক্ষকে হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ইতিহাস, ইংরেজি, দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও উপাধ্যক্ষের কার্যালয়—এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অফিস সহায়ক নেই। সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার থাকলেও সেখানে গ্রন্থাগারিক বা সহকারী গ্রন্থাগারিক নেই। মাত্র একজন পিয়ন দিয়ে গ্রন্থাগার পরিচালনা করা হচ্ছে।

ছয় থেকে সাতটি বহুতল ভবন ও প্রায় ৩০টি শৌচাগার পরিষ্কারের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় উদ্যোগে 'কাজ নাই, মজুরি নাই' ভিত্তিতে ১৫ জনকে কাজে নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতার নাতি ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. জামালুল ইসলাম বলেন, একসময় আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীরা এ কলেজে পড়তে আসতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মিজান উদ্দীন ও বিচারপতি ফজলে রাব্বির মতো কৃতী ব্যক্তিরা এ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কলেজটি অস্তিত্বের সংকটে। দ্রুত জনবল নিয়োগ না দিলে ঐতিহ্য ও হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে।