যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের পাহাড়ঘেরা শহর অ্যাশভিলে সম্প্রতি এক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন লেখক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। প্রবাসী বন্ধু আমজাদ তাকে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলছিলেন, কিন্তু নামটি রহস্যময় রাখছিলেন। পরে জানা যায়, আমজাদ তাকে অ্যাশভিলের ব্লু রিজ পর্বতমালায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যেখানে তিনি আগেও গিয়েছিলেন। দুজনের সময় মেলেনি, তবে ৮ আগস্ট লেখকের মেয়ে অনন্যা তাকে অ্যাশভিলে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। যাওয়ার আগে আমজাদ তাকে জন ডেনভারের বিখ্যাত গান 'টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস' শোনার পরামর্শ দেন।

বেলমন্ট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে বেলা তিনটার দিকে তারা অ্যাশভিল পৌঁছান। সেখানে বিল্টমোর এলাকার হ্যাম্পটন ইন বাই হিলটনে উঠে ছয়তলার রুম থেকে পাহাড় ও মেঘের অসাধারণ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন লেখক। বোদলেয়ারের বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি মনে পড়ে যায় তার—'আমি ভালোবাসি মেঘ, ওই উঁচুতে আশ্চর্য মেঘদল'। এরপর তারা ব্লু রিজ পার্কওয়ে ধরে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেন। ৪৬৯ মাইল দীর্ঘ এই সড়কটি অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার বিভিন্ন শৃঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে। রিচল্যান্ড ব্যালসাম এলাকায় সড়কটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় পৌঁছেছে। পথে রয়েছে দুই শতাধিক ওভারলুক, যেখান থেকে পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।

বিকেল চারটার দিকে তারা ২ হাজার ৯১৫ ফুট উচ্চতার ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে পৌঁছান। তখনও সন্ধ্যা হতে সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি, কিন্তু চারপাশ অন্ধকার। মেঘের দাপটে পুরো এলাকা ঢেকে গেছে। লেখকের জামাই শুভ জানান, তারা এখন মেঘের ভেতরে অবস্থান করছেন। গাড়ি থেকে নেমে তারা মেঘে ঘেরা পাহাড়ের মাটিতে পা রাখেন। একদিকে খাড়া কালো পাথরের পাহাড়, অন্যদিকে অতল খাদ যার ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো গাছপালা। লেখক মনে করেন, মেঘ না সরে গেলেই ভালো, কারণ মেঘের ভেতরে থাকাটাই তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। নাতনি নোরা সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাচ্ছিলেন এই দৃশ্য দেখে। সেখানে আরও কয়েকটি গাড়ির মানুষ মূর্তির মতো নীরবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন, আর একটি ক্যারাভ্যানও ছিল যারা সারা রাত পাহাড়ের নির্জনতায় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিল।

এই অভিজ্ঞতা লেখকের মনে ফিরিয়ে আনে দার্জিলিংয়ের স্মৃতি। সেখানেও মেঘ এসে রাস্তায় ঘোরাফেরা করত, মানুষকে ছুঁয়ে চলে যেত, কখনো সবকিছুকে অদৃশ্য করে দিত। লেখক মনে করেন, মেঘের কোনো দেশ বা সীমান্ত নেই। পাহাড়ের গায়ে মেঘ নামলে পৃথিবীর দুই প্রান্তের মানুষ একই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। রোদেলা দিনে পাহাড়ের সৌন্দর্য ও উচ্চতা দেখা যায়, কিন্তু মেঘের ঘোমটায় ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য শুধু অনুভব করা যায়, যা কল্পনাকে আরও সক্রিয় করে তোলে। ফেরার পথে ইউটিউবে জন ডেনভারের সেই গানটি বাজিয়ে দেন লেখক। অর্ধশতাব্দীর বেশি পুরোনো এই গানে ব্লু রিজ মাউন্টেনসের উল্লেখ আছে এবং এর মূল সুর ঘরে ফেরার আকুতি নিয়ে। লেখকের কাছে মনে হয়েছে, পাহাড়ের কাছে গেলে পৃথিবীর সব মানুষের স্মৃতি এক জায়গায় মিশে যায়—কেউ ফিরে যেতে চায় বাড়িতে, কেউ শৈশবে, কেউ কোনো প্রিয় মানুষের কাছে।