সিলেটের শিবগঞ্জে বেড়ে ওঠা অভিরূপ কুমার সিংহ আজ একজন স্বনামধন্য রন্ধনশিল্পী, ফুড কার্ভিং ও প্লেটিং শিল্পী, প্রশিক্ষক এবং বিভিন্ন রান্নাবিষয়ক প্রতিযোগিতার বিচারক। তার শুরুটা অবশ্য ছিল ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে। সিলেটের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জার কাজ করতে গিয়েই তিনি খাবারের জগতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন। রেস্তোরাঁর পরিবেশ, আলো, সাজসজ্জা এবং উপস্থাপনা যে মানুষের খাবার উপভোগের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিতে পারে, তা কাজ করতে করতেই উপলব্ধি করেন তিনি।
পরে দেশের নানা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গেও কাজ করেছেন অভিরূপ। রং, নকশা ও বিন্যাস নিয়ে কাজের সূত্রেই একসময় তার মনে হয়, খাবারের প্লেটও তো সৃজনশীলতার একটি ক্যানভাস। সেখান থেকেই ফুড স্টাইলিং ও খাবারের নান্দনিক উপস্থাপনার প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। তবে তার কাছে নান্দনিকতা কখনোই শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাষ্যে, খাবার প্রথমে চোখের শান্তি, পরে মনের তৃপ্তি; কিন্তু প্লেট যতই সুন্দর হোক, স্বাদ যদি না থাকে, সেই সৌন্দর্য অপূর্ণ।
রন্ধনশিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার পেছনে বেশ কয়েকজনের অবদানের কথা স্মরণ করেন অভিরূপ। বিশেষভাবে উল্লেখ করেন দেশের প্রখ্যাত রন্ধনবিশেষজ্ঞ কেকা ফেরদৌসী, রাহিমা সুলতানা রিতা এবং তার রান্নার শিক্ষাগুরু সিদ্দিকা কবীরকে। ২০০৭ সালে কেকা ফেরদৌসীর সাথে প্রথম টেলিভিশন রান্নার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি, যা তার জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। সিদ্দিকা কবীরের কাছ থেকে তিনি শুধু একটি পদ কীভাবে রান্না করতে হয় তা নয়, উপকরণকে বোঝা, স্বাদের ভারসাম্য তৈরি করা এবং রান্নার প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা পেয়েছেন, যা ধীরে ধীরে তার কাজের দর্শনে পরিণত হয়েছে।
টেলিভিশনের পর্দায় তার পথচলা দীর্ঘ। এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি। লন্ডনের ভিওআইসি চ্যানেলের 'ইকরা রান্নাঘর' অনুষ্ঠানে চারটি মৌসুম কাজ করেছেন, প্রতিটি মৌসুমে প্রায় ৩০টি করে রেসিপি তৈরি করেছেন। এই দীর্ঘ যাত্রা তাকে দ্রুত কাজ করা, নির্দিষ্ট সময়ে পরিকল্পনা করা এবং পরিচিত খাবারকে দর্শকের সামনে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা দিয়েছে।
প্রতিযোগিতার মঞ্চেও কম সফল নন তিনি। ২০০৮ সালে 'আনন্দ আলো রন্ধন প্রতিযোগিতা'য় দ্বিতীয়, ২০০৯ সালে 'ডিপ্লোমা মিষ্টি লড়াই'-এ তৃতীয় এবং একই বছরে 'রুপচাঁদা ফুড কার্নিভালে' প্রথম স্থান অর্জন করেন। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিযোগীদের নিয়ে আয়োজিত 'শেফ অব দ্য মনিটর' প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবও আছে তার। 'সেরা রাঁধুনি ১৪২২'-এ সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগী থেকে এখন তিনি নিজেই বিচারকের আসনে। বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক আয়োজনের বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে 'ড্যান কেক ডেজার্ট', 'রুপচাঁদা সুপার শেফ' ও আকিজ প্লেটিং প্রতিযোগিতার বিভাগীয় বিচারক পদ। সিলেটের শ্রুতি পিঠা প্রতিযোগিতা এবং নিশিতা ফুড কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের রান্না প্রতিযোগিতায়ও ছিলেন প্রধান বিচারক। তার মতে, একজন বিচারকের কাজ শুধু ভুল ধরা নয়, একজন নতুন রন্ধনশিল্পীর সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা।
বর্তমানে সিলেটে রান্না, ফুড কার্ভিং ও প্লেটিং নিয়ে বিভিন্ন কর্মশালা পরিচালনা করছেন অভিরূপ। তার পাঠশালায় নতুনদের হাতে-কলমে শেখানো হয় খাবারের নান্দনিক উপস্থাপনার নানা দিক। ফুড কার্ভিং তার কাছে শুধু ফল বা সবজি কেটে ফুল বানানোর বিষয় নয়, এটি একটি শিল্প; তবে উপস্থাপনা যেন খাবারের আসল পরিচয়কে আড়াল না করে, সেদিকে তিনি সদা সচেতন।
তার রান্নায় সিলেটের প্রভাব গভীর। শিবগঞ্জে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় খাবার, উপকরণ ও স্বাদের সাথে তার পরিচয়। সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস বা শিরনির মতো খাবারের সাথে জড়িয়ে আছে একটি অঞ্চলের মানুষ, তাদের জীবনযাপন আর স্মৃতি। তিনি চান নতুন প্রজন্মও নিজেদের স্থানীয় খাবারকে নতুন করে চিনুক। তার বিশ্বাস, নতুনত্বের জন্য পুরোনোকে বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং ঐতিহ্যকে বুঝে, তার স্বাদ ও পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
সিলেটের বহুমাত্রিক খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যে মণিপুরি রান্নার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ। এই রান্নার সরলতাই তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে। খুব বেশি মসলা, তেল বা পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই কীভাবে অসাধারণ স্বাদ তৈরি করা যায়, সেটিই তার কাছে বিস্ময়কর। স্থানীয় শাকসবজি, মাছ, বিভিন্ন পাতা ও গুল্মের ব্যবহার এবং বিশেষ করে জেনম পাতার নিজস্ব ঘ্রাণ ও স্বাদ তাকে আকর্ষণ করে। তার মতে, মণিপুরি খাবার নিয়ে কাজ করতে গেলে শুধু রেসিপি জানলেই হয় না, জানতে হয় সেই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি, উৎসব ও জীবনযাপনের গল্প।
সিলেট শহরে তার নিজস্ব গার্ডেনিং রেস্তোরাঁ 'চাখুম' তার রন্ধনভাবনা ও নস্টালজিয়ার প্রতি ভালোবাসার এক বাস্তব প্রকাশ। এখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি রয়েছে তার নিজস্ব সিগনেচার পদ এবং বিভিন্ন ফিউশন খাবার। পুরোনো টেলিভিশন, রেডিও, ডায়াল টেলিফোন, ড্রেসিং টেবিল কিংবা আলমারি দিয়ে সাজানো পরিবেশ জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা আবহ। এই নস্টালজিয়া তার কাছে কেবল সাজসজ্জার অংশ নয়, বরং পুরোনোকে নতুন প্রজন্মের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার একটি প্রয়াস, যা তার রান্নার দর্শনের সাথেও মিলে যায়।
নতুন প্রজন্মের যারা রান্নাকে পেশা হিসেবে নিতে চান, তাদের জন্য তার পরামর্শ—প্রথমে নিজের শিকড়কে জানতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রান্না, আধুনিক কৌশল ও নতুন প্রযুক্তি শেখা দরকার, কিন্তু নিজের দেশের খাবার, উপকরণ ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা না থাকলে একজন রন্ধনশিল্পীর নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা কঠিন। রেসিপি মুখস্থ করার বদলে উপকরণকে বুঝতে হবে এবং ধৈর্য ধরতে হবে, কারণ রান্না শেখার কোনো শর্টকাট নেই। বর্তমানে তিনি আইসিআই ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট পরিবারের সাথে যুক্ত এবং বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোনমিক শেফ ইউনিটির সদস্য। ভবিষ্যতে তিনি বাংলাদেশের স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার নিয়ে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করতে চান; গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরতে চান। তার কাছে, একটি খাবার হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি রেসিপি হারিয়ে যাওয়া নয়; হারিয়ে যায় একটি সময়ের স্মৃতি, মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির একটি অংশ।




