ক্যানসার শব্দটি শুনলেই সাধারণত আতঙ্ক কাজ করে। মানবদেহের প্রায় সব অঙ্গেই এই রোগ ছড়াতে পারে, তবে হার্টের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। পরিসংখ্যান বলছে, ত্বকের ক্যানসারে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়, প্রতি পাঁচজনে একজন। এরপরই অবস্থান ফুসফুস ও লিভার ক্যানসারের। কিন্তু হার্টে ক্যানসার হওয়ার ঘটনা এতটাই বিরল যে, প্রতি ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র একজনের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটতে দেখা যায়। এমনকি কারও হার্টে ক্যানসার ধরা পড়লেও, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে তা শরীরের অন্য কোনো অংশ থেকে ছড়িয়ে আসে, হার্ট নিজে থেকে তৈরি করে না।

ক্যানসার মূলত কোষ বিভাজনের ত্রুটির ফল। শরীরের পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মরে গিয়ে নতুন কোষ জন্মানোর প্রক্রিয়াকে বলা হয় পুনর্জন্ম। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা মিউটেশন ঘটলে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি শুরু হয়, যা ক্যানসারে রূপ নেয়। যে অঙ্গগুলোর কোষ দ্রুত বিভাজিত হয়, সেখানেই মিউটেশনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যেমন, ধূমপানের কারণে ফুসফুসের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীর দ্রুত নতুন কোষ তৈরি করতে যায়, ফলে মিউটেশনের সুযোগ বেড়ে যায়।

হার্টের কোষের পুনর্জন্মের হার অত্যন্ত ধীর। বছরে মাত্র এক শতাংশ হারে হার্টের কোষ বৃদ্ধি পায়। জন্মের সময় যতগুলো হার্ট কোষ থাকে, সারা জীবনেও তার অর্ধেকের বেশি প্রতিস্থাপিত হয় না। অন্যদিকে, ত্বকের কোষ প্রতি ৪০ থেকে ৫৬ দিনের মধ্যে পুরোপুরি বদলে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিবর্তনের মাধ্যমে হার্ট এই বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে হার্ট প্রথম দিন থেকেই মজবুতভাবে কাজ করার জন্য দ্রুত কোষ বিভাজনের ক্ষমতা হারিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হলে হার্ট নতুন কোষ তৈরি না করে শক্ত আঁশযুক্ত স্কার টিস্যু দিয়ে ক্ষত সারানোর চেষ্টা করে। অ্যাক্সোলোটলের মতো কিছু উভচর প্রাণী অবশ্য হার্টের অংশবিশেষ পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হার্টের ক্রমাগত স্পন্দনের কারণে সৃষ্ট শারীরিক চাপও ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হার্ট যখন স্বাভাবিকের চেয়ে কম চাপে কাজ করে, তখন কোষের পুনর্জন্মের হার বেড়ে যায়, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ইতালির ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজির গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, কম চাপে থাকা হার্টে ক্যানসার কোষ অনেক দ্রুত ছড়ায়। হার্টের প্রতিটি স্পন্দনের ফলে তৈরি হওয়া চাপ একধরনের বিশেষ প্রোটিনকে প্রভাবিত করে, যা ক্যানসার বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত জিনগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসার নতুন পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

হার্ট ও ক্যানসারের মধ্যে আরও কিছু গভীর সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেছে। জার্নাল অব দ্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত ২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হার্টের কার্যকারিতায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন শরীরের অন্য কোথাও ক্যানসার হওয়ার আগাম সংকেত হতে পারে। প্রায় ১৮ বছর ধরে হাজার হাজার রোগীর এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, যাদের হার্টের বাম অলিন্দের কার্যকারিতা কমে গিয়েছিল, তাদের পরবর্তীকালে কোলন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। গবেষণার প্রধান লেখক শিনচিয়াং কাই জানিয়েছেন, হার্টের এই পরিবর্তনগুলো ক্যানসার তৈরির সঙ্গে জড়িত জৈবিক প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে। এই সংযোগ পুরোপুরি পরিষ্কার হলে হার্টের অবস্থা দেখেই ক্যানসার আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হবে। হার্টে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা নগণ্য, তবে এই অঙ্গের গবেষণা ক্যানসার মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।