রাজধানীর কংক্রিটের জঙ্গলে হাতিরঝিল এখনো অন্যতম বড় জলজ বাস্তুতন্ত্র হিসেবে টিকে থাকলেও এবার নতুন এক হুমকির মুখে পড়েছে এটি। সেখানে দেখা মিলছে বিশ্বের অন্যতম আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির কচ্ছপ রেড ইয়ারড স্লাইডারের। জীববৈচিত্র্য বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না নিলে সাকার ফিশের মতোই দেশীয় জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে এই কচ্ছপ।
গবেষণায় দেখা গেছে, একটি স্ত্রী রেড ইয়ারড স্লাইডার বছরে ছয়বার পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে এবং প্রতিবারে ৩০টি পর্যন্ত ডিম দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৫ সালের এক জনস্বাস্থ্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়, এই প্রজাতির কচ্ছপ থেকে সালমোনেলা নামক জীবাণু মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিওডব্লিওএফ) তাদের ওয়েবসাইটে সতর্ক করে বলেছে, প্রাকৃতিক বিচরণ এলাকার বাইরে ছাড়া হলে এ কচ্ছপ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম।
হাতিরঝিলের বিভিন্ন স্থানে গাছের শিকড়, ভাসমান গুঁড়ি বা রোদ পোহানোর জায়গায় এদের বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর আরও কয়েকটি পুকুরেও এই প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক জানিয়েছেন, শুধু হাতিরঝিল নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পুকুরেও দেখা গেছে এ কচ্ছপ। এগুলো সর্বভূক প্রাণী। কোনোভাবে যদি নদী-খাল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশীয় জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য তা বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
অসীম মল্লিক আরও বলেন, চীন ও থাইল্যান্ড হয়ে বিমানবন্দর ব্যবহার করে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এসব প্রজাতির কচ্ছপ। শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে অ্যাকুয়ারিয়ামে বিদেশি কচ্ছপ পালনের বাজার তৈরি হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর পর কচ্ছপ বড় হয়ে গেলে অনেকে আর রাখতে চান না এবং সেগুলো পুকুর, লেক বা জলাধারে ছেড়ে দেন। মিরপুরের এক অভিযানে ১ হাজার ৪টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ৮৪৬টি রেড ইয়ারড স্লাইডার কচ্ছপের বাচ্চা ছিল। এছাড়াও উদ্ধার করা হয় ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং টার্টল, যা আরও ভয়ংকর। এই প্রজাতির কচ্ছপ ৩৫ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে এবং উভয় প্রজাতিই অত্যন্ত ক্ষতিকর।
অসীম মল্লিক জানান, কাজী শহীদ উল্লাহ দস্তগীর নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দেশে-বিদেশে বিক্রির জন্য এসব কচ্ছপ মজুত করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে তদন্ত চলছে। তিনি আরও বলেন, লাগেজের মাধ্যমে বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও সীমান্তপথ ব্যবহার করে বন্য প্রাণী পাচার হচ্ছে। বিমানবন্দরে এগুলো শনাক্তের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে এবং ফেসবুকভিত্তিক পেজগুলোর ওপর নজরদারির ক্ষেত্রেও সক্ষমতার অভাব আছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকেও এই কচ্ছপের উপস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ইতিমধ্যে দেখা গেছে সাকার ফিশ কীভাবে বুড়িগঙ্গা থেকে শীতলক্ষ্যা, তুরাগ হয়ে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এক বছর ধরে গবেষণায় সাকার ফিশের ব্যাপক বিস্তৃতি চোখে পড়েছে। তিনি অবিলম্বে আগ্রাসী প্রজাতির অবৈধ আমদানি ঠেকানোর পাশাপাশি অনলাইন ও ফেসবুকের পেজগুলো আইনের আওতায় আনা, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে নজরদারি বাড়ানো এবং এসব প্রাণী শনাক্তে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কয়েক বছর আগেও হাতিরঝিলে সাকার ফিশ নিয়ে আলোচনা ছিল না, কিন্তু এখন সেই মাছ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের নদী ও পুকুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে রেড ইয়ারড স্লাইডারের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য দেখতে হবে।




