রাজধানীর বনানীতে নগদের প্রধান কার্যালয়ে শুরু হয়েছে প্রথমা প্রকাশনের আয়োজনে দুই দিনব্যাপী বইমেলা ‘নগদ-এ প্রথমা বইবন্ধন’। সোমবার দুপুরে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ ফিতা কেটে এ মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মেলা চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত।
আয়োজকদের তথ্যমতে, মেলায় নগদের কর্মীরা প্রথমা প্রকাশনের বই ২৫ শতাংশ ছাড়ে কেনার সুযোগ পাবেন। বিদেশি বইয়ের ক্ষেত্রে ছাড়ের হার ৫ শতাংশ। মেলা থেকে সবচেয়ে বেশি বই কেনা তিনজন কর্মীকে প্রথমা প্রকাশনের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করার কথাও রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাজ্জাদ শরিফ বলেন, আন্তর্জাতিক জরিপে বই পড়ার অভ্যাসের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভারতের মতো প্রযুক্তিতে উন্নত দেশগুলোতে বই পড়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন, ৩৫ বছরের কম বয়সী তরুণদের মধ্যে বই পড়ার হার সবচেয়ে বেশি।
তিনি আরও বলেন, এসব দেশে জ্ঞান ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়; কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তির পরিচয় ও প্রভাবকেই বড় করে দেখা হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাজ্জাদ শরিফ জানান, শৈশবে পড়া ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প’, ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ এবং হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের রূপকথা তাঁর জীবনদৃষ্টি বদলে দিয়েছিল। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রামের সুমতি’সহ নানা বই পড়েছেন তিনি। জীবনে যতদূর এগিয়েছেন, তার পেছনে বইয়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন তিনি।
সাজ্জাদ শরিফ বলেন, বইয়ের মাধ্যমেই অতীতের জ্ঞান এবং সভ্যতার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা আমাদের হাতের নাগালে পৌঁছে যায়। সক্রেটিস, নিউটন, আইনস্টাইন বা রবীন্দ্রনাথের মতো মহান ব্যক্তিরা চিরকালের জন্য চলে গেলেও তাঁদের চিন্তাভাবনা বইয়ের পাতায় পাতায় আমাদের সঙ্গে কথা বলে। তিনি বই উপহার দেওয়ার আন্দোলন আবারও চালু করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বই কেবল তথ্য বা জ্ঞানের ভাণ্ডার নয়; এটি মানুষকে নিজের সংকীর্ণ চিন্তার গণ্ডি পেরিয়ে অন্যের চিন্তা ও কল্পনার জগতে প্রবেশের পথ খুলে দেয়। বই পড়ার সময় পাঠক লেখকের সঙ্গে এবং নিজের সাথেও তর্কে লিপ্ত হন, যার ফলে চিন্তার পরিধি প্রসারিত হয়।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বড় লাইব্রেরি না থাকলেও একটি ছোট বইয়ের কর্নার তৈরি করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি। মাত্র ১০-২০টি বইও কিছু কর্মীকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে সন্তানদের বই উপহার দেওয়া এবং নিজেরাও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে নগদের প্রশাসক মো. মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, বর্তমান প্রজন্ম বই পড়ার বদলে রিলস ও ডিজিটাল কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করছে। শিশুদের বইমুখী করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদেরও মোবাইল, ফেসবুক ও ইউটিউবে সময় নষ্ট না করে বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রথম আলোর সঙ্গে এটি দ্বিতীয় আয়োজন উল্লেখ করে মোতাছিম বিল্লাহ জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে চান তারা। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে বুক কর্নার চালু হওয়াকে তিনি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন। নগদও ভবিষ্যতে এমন একটি বুক কর্নার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে এবং প্রথমা ও নগদের যৌথ উদ্যোগে বই প্রকাশের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
নগদের জ্যেষ্ঠ সহযোগী প্রশাসক সৈয়দ হীমঈয়ানউদ্দিন আহমেদ তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন, স্কুলজীবনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ার আয়োজনের মাধ্যমেই তাঁর সঙ্গে বইয়ের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেবা প্রকাশনীর বই পড়ার পাশাপাশি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে কাজের সুযোগ পান তিনি। বই তাঁকে নতুন কিছু জানতে এবং ভিন্ন জগৎ আবিষ্কারের শিক্ষা দিয়েছে। তিনি সবাইকে বই কিনে পড়ার এবং নিজেদের মধ্যে বই পড়ার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আহ্বান জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নগদের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে কর্মীরা মেলার স্টলগুলোতে ঘুরে ঘুরে পছন্দের বই দেখেন এবং অনেকে বই কিনে নেন।




