সারাদিনের কাজের পর যখন শরীর ও মন উভয়েই ক্লান্ত, তখন ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়াও দুরূহ হয়ে পড়ে। যেমন দিন শেষে রাতের খাবার নিয়ে ভাবনা, অথবা অফিস শেষে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সরাসরি বাড়ি ফেরার তাগিদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় কগনিটিভ ফ্যাটিগ বা মানসিক ক্লান্তি, যা শুধু শারীরিক দুর্বলতা নয়, বরং আমাদের চিন্তা করার এবং নতুন কাজে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি এবং কেনেডি ক্রিগার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সম্প্রতি মানসিক ক্লান্তির এই প্রক্রিয়া নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেছেন। ২৮ জন স্বেচ্ছাসেবকের ওপর চালানো এই পরীক্ষায় ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (fMRI) প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রথমে অংশগ্রহণকারীদের এমন কিছু কাজ দেওয়া হয় যা তাদের মস্তিষ্কে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে। এরপর তাদের মেমরি পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অক্ষরের সারি মনে রাখতে বলা হয়, যার মধ্যে সহজ এবং অত্যন্ত কঠিন উভয় ধরনের কাজই ছিল।
কাজগুলো করে যখন তারা পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন তাদের সামনে দুটি বিকল্প রাখা হয়। প্রথম বিকল্পটি ছিল একটি সহজ মেমরি টেস্ট, যা সম্পন্ন করলে পাওয়া যাবে ১ ডলার। অন্যদিকে দ্বিতীয়টি ছিল অনেক কঠিন একটি পরীক্ষা, যেখানে সফল হলে পুরস্কার হিসেবে মিলবে ৮ ডলার। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা মানসিকভাবে যত বেশি ক্লান্ত হচ্ছিলেন, তারা কম পারিশ্রমিকের সহজ কাজটি বেছে নেওয়ার দিকেই তত বেশি ঝুঁকছিলেন। অথচ কঠিন কাজটি সম্পন্ন করলে তাদের আয় হতো কয়েক গুণ বেশি। এই আচরণ থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মানসিক ক্লান্তি আমাদের মস্তিষ্ককে পুরস্কার বা লাভের চেয়ে পরিশ্রম কমানোর বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার পেছনে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম কাজ করে। অংশগ্রহণকারীরা যখন একের পর এক ক্লান্তিকর মেমরি টেস্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের মস্তিষ্কের সামনের দিকের ডরসোলেটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশ থেকে মাঝামাঝি ডান দিকের রাইট ইন্টেরিয়র ইনসুলা অংশে তীব্র সংকেত প্রেরিত হতে থাকে। রাইট ইন্টেরিয়র ইনসুলার মূল কাজ হলো শরীরের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির হিসাব রাখা। এই দুই অংশের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান যত বাড়তে থাকে, মানুষ কঠিন কাজ থেকে ততটাই দূরে সরে যেতে চায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্কের এই সিস্টেমটি মূলত আমাদের সুরক্ষার জন্য কাজ করে। শারীরিক ও মানসিক ব্যবস্থা যাতে অতিরিক্ত চাপে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য ক্লান্তির সংকেতগুলো আমাদের নতুন কাজে শক্তি খরচ করা থেকে বিরত রাখে। চরম মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনের মতো অবস্থায় এই প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। তবে এই গবেষণা ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট পথগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন ধরনের থেরাপি বা ওষুধ আবিষ্কারের পথ খুলে দিতে পারে বলে আশা প্রকাশ করছেন গবেষকরা।
গবেষকরা আরও বলেছেন, কোনো কাজের পেছনের গুরুত্ব যদি কেউ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন, তবে এই মানসিক ক্লান্তিকেও কিছুটা হার মানানো সম্ভব। কাজটি কেন নিজের বা প্রিয়জনের জন্য এতটা প্রয়োজনীয়, সেই চিন্তাটি মনে নতুন করে সাজিয়ে নিতে পারলে ক্লান্তির মধ্যেও অতিরিক্ত শক্তি পাওয়া যেতে পারে।




