ইসলামের উত্তরাধিকার আইন অনুসারে নারীরা পৈতৃক সম্পত্তির নির্ধারিত অংশ পাওয়ার অধিকার রাখেন, যদিও বাস্তব সমাজে আজও অনেক নারী এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। জাহেলি যুগে আরব সমাজে নারী, শিশু ও দুর্বলদের উত্তরাধিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না; বরং নারীকে প্রায়শই সম্পত্তির অংশ হিসেবেই গণ্য করা হতো। ইসলামের আগমনের পর কোরআনের সুরা নিসার ৭ নম্বর আয়াতে প্রথমবারের মতো নারীকে উত্তরাধিকারের স্বতন্ত্র ও নির্ধারিত অধিকার প্রদান করা হয়। এতে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষের যেমন অংশ রয়েছে, তেমনি নারীরও অংশ রয়েছে—তা কম হোক বা বেশি। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
কোরআনের সুরা নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নম্বর আয়াতে নারীর বিভিন্ন অবস্থানে উত্তরাধিকারের অংশ উল্লেখ করা হয়েছে। কন্যার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, একজন পুত্রের অংশ দুজন কন্যার অংশের সমান। একজন মাত্র কন্যা থাকলে তিনি অর্ধেক সম্পদের অধিকারী হবেন, আর দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন। মায়ের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তিনি এক-ষষ্ঠাংশ পাবেন; সন্তান না থাকলে এবং একাধিক ভাই-বোন না থাকলে তিনি এক-তৃতীয়াংশের অধিকারী হবেন, তবে ভাই-বোন থাকলে অংশ এক-ষষ্ঠাংশ। স্ত্রীর ক্ষেত্রে, স্বামীর সন্তান না থাকলে তিনি এক-চতুর্থাংশ, আর সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ পাবেন। বোনের উত্তরাধিকার: মৃত ব্যক্তি যদি সন্তান ও পিতা না রেখে মারা যান এবং একমাত্র বোন থাকলে তিনি অর্ধেক পাবেন; দুই বা ততোধিক বোন থাকলে এবং তাদের সঙ্গে কোনো ভাই না থাকলে তারা দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন। ভাই-বোন উভয় থাকলে একজন ভাইয়ের অংশ দুই বোনের অংশের সমান।
সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, ইসলামে নারী সব সময় পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পান না। কিছু ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান অংশ পান, যেমন মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে মা ও বাবা উভয়েই এক-ষষ্ঠাংশ করে পান। ইসলামি আইনবিদদের মতে, উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণে পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক দায়বদ্ধতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পুরুষের ওপর পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের ব্যয়, দেনমোহর প্রদান ইত্যাদি দায়িত্ব অর্পিত, অন্যদিকে নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যয়ভার তার ওপর বাধ্যতামূলক নয়।
উত্তরাধিকার বণ্টনে কারচুপি বা নারীকে তার প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা ইসলামে গুরুতর পাপ হিসেবে গণ্য। সুরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুরা নিসার ১৩-১৪ আয়াতে উত্তরাধিকার আইনকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা বলা হয়েছে এবং এর লঙ্ঘনকে জাহান্নামের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমি দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমিনের বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।
সামাজিক বাস্তবতায় নারীরা এখনো কেন বঞ্চিত হন, তার মধ্যে রয়েছে শরিয়তের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা, অতিরিক্ত লোভ, এবং সামাজিক চাপ। অনেক ক্ষেত্রে বোনদের মানসিক চাপ দিয়ে সম্পত্তির দাবি থেকে বিরত রাখা হয়। 'মেয়েরা পরের বাড়ির মানুষ' বা 'সম্পত্তি নিলে বাপের বাড়ির সম্মান নষ্ট হবে'—এ ধরনের যুক্তি দিয়ে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এ ছাড়া উত্তরাধিকার বণ্টনে দীর্ঘ বিলম্ব জটিলতা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে পরিবারে ইসলামের বিধান সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং নারীদের নিজেদের শরয়ি অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।




