বাংলাদেশের বাজারে সম্প্রতি হলুদ রঙের কাঁচা খেজুরের সরবরাহ ব্যাপক হারে বেড়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন ফলের দোকান, ফুটপাত ও ভ্যানে এই ফলটি স্তূপ করে বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে দেখতে দেশীয় লটকনের মতো হলেও হাতে নিলে আকার ও গঠনে পার্থক্য স্পষ্ট হয়। লম্বাটে ও ছোট আকারের এই ফলটি কামড় দিলে শক্ত শাঁসে মচমচে ভাব পাওয়া যায়, সঙ্গে হালকা কষ ও মিষ্টি স্বাদ। খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন নামে ফলটি বিক্রি করছেন—কেউ মিসরের, কেউ সৌদি আরবের, আবার কেউ দুবাইয়ের বলে দাবি করছেন। কক্সবাজারে এটি 'মিসরি হলুদ খেজুর' নামেও পরিচিতি পেয়েছে। তবে পাইকারি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের বক্তব্য, বর্তমানে বাজারে থাকা কাঁচা খেজুরের বড় অংশই ভারত থেকে আসছে।
কয়েক বছর আগেও আমদানি করা কাঁচা খেজুরের দাম ছিল ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা প্রতি কেজি। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মান ও স্থানভেদে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দাম কমায় ফলটি আর শুধু অভিজাত বিপণিবিতান বা নির্দিষ্ট ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ভ্যানেও এটি বিক্রি হচ্ছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও কৌতূহল থেকে কিনছেন। চট্টগ্রাম নগরের ২ নম্বর গেট এলাকায় ভ্যানে করে কাঁচা খেজুর বিক্রি করছিলেন মোকাব্বের আলী। তিনি জানান, প্রথম দেখায় অনেকে ফলটিকে লটকন মনে করেন, তবে স্বাদ ভালো হওয়ায় পুনরায় ক্রয় করছেন। তিনি স্টেশন রোডের আড়ত থেকে প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় কিনে ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন, প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি বিক্রি হচ্ছে। আগ্রাবাদ মোড়ে প্রতি কেজি ৩২০ টাকায় বিক্রি করছিলেন মোহাম্মদ হানিফ, যিনি ক্রেতাদের সৌদি আরব থেকে আসা বলে জানাচ্ছিলেন। প্রতিদিন তাঁর ২০ থেকে ৩০ কেজি বিক্রি হচ্ছে। প্রবর্তক মোড়ে ফল বিক্রেতা মোমিন উল্লাহ প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় খেজুর বিক্রি করছিলেন, যার উৎস বলে তিনি দুবাই উল্লেখ করেন। তাঁর কাছ থেকে ১০০ টাকার খেজুর কিনে বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ দিদার বলেন, প্রথমবার কিনেছেন এবং স্বাদ ভালো লাগলে আবার কিনবেন।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলের বাজার ফলমন্ডিতে এখন প্রায় প্রতিদিন ট্রাকে করে কাঁচা খেজুর আসছে। ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে এসব চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, যা থেকে পণ্য চট্টগ্রাম, ঢাকা, যশোর, সিলেট ও অন্যান্য বাজারে যাচ্ছে। ফলমন্ডির মেসার্স আল্লাহর দয়া স্টোরের কর্ণধার সাহাব উদ্দিন জানান, দুই বছর ধরে ভারতে কাঁচা খেজুরের ফলন ভালো হচ্ছে। আগে মূলত সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও থাইল্যান্ড থেকে বিমানে আমদানি হতো, যার ফলে দাম বেশি থাকত। ভারত থেকে সড়কপথে সরাসরি আসায় পরিবহন খরচ কমেছে এবং সরবরাহ বেড়েছে, যার প্রভাব দামে পড়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি ১০ কেজির ক্রেট মানভেদে ১,২০০ থেকে ২,৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের বড় ও শক্ত ফলের দাম বেশি; নরম হয়ে গেলে দাম দ্রুত কমে যায়। কোনো কোনো দিন এক ক্রেট ১,৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, আবার মান খারাপ হলে ১,৫০০ টাকা বা তারও নিচে নেমেছে।
আমদানিকারক মোহাম্মদ আলী জুবায়ের খান, যিনি হজরত বেলায়ত আলী শাহ ফার্মের মাধ্যমে ব্যবসা করেন, বলেন প্রতিবছর ভারত থেকে সীমিত পরিমাণে কাঁচা খেজুর আসলেও এবার আমদানি বেড়েছে। মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো থাকলেও চাহিদার তুলনায় বেশি পণ্য ঢুকছে, যার ফলে অনেক আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছেন। বর্তমানে বাজারে বেশি বিক্রি হওয়া হলুদ কাঁচা খেজুর ভারতের রাজস্থান থেকে আসছে। কাঁচা খেজুরের স্থায়িত্ব খুব কম, যা ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। গাছ থেকে সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে না পারলে ফল নরম হয়ে যায়, রং বদলে বাদামি হতে শুরু করে বা পচে যায়। জুবায়ের খান জানান, গাছ থেকে পাড়ার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই খেজুর বাজারে পৌঁছানো জরুরি। ভারত থেকে সাধারণ ট্রাকে খোলা অবস্থায় পণ্য আসে, ফলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও সংরক্ষণের অভাবে দীর্ঘ সময় ভালো রাখা যায় না। একটি ট্রাকে প্রায় ২৪ টন কাঁচা খেজুর থাকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান মৌসুমে ১৫ থেকে ৩০ ট্রাক পর্যন্ত আমদানি করে। ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ায় বাজারে দাম পড়ে গেলে সেটি ধরে রাখার সুযোগ নেই।
কাঁচা খেজুরের মৌসুম ছোট—জুলাই ও আগস্ট মাস মূল সময়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই আমদানি, পরিবহন ও বিক্রি শেষ করতে হয়। বাজারে একই সময়ে বেশি ট্রাক ঢুকে পড়লে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে যায়। ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রামের ফলমন্ডিতে গতকাল এক দিনে ১৩ ট্রাক কাঁচা খেজুর এসেছে। তাঁদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন সব মিলিয়ে ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক পর্যন্ত খেজুর ঢুকছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই মাসে ভারত ও মিসর থেকে মোট ১৪১ টন কাঁচা খেজুর আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম ১৮ দিনেই দেশে এসেছে ২৭৭ টন কাঁচা খেজুর, যা প্রায় পুরোটাই ভারত থেকে। অর্থাৎ গত বছরের পুরো জুলাই মাসের তুলনায় এবার প্রথম ১৮ দিনেই আমদানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ভারত থেকে সড়কপথে আসায় পরিবহন ব্যয় কমলেও আমদানি শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়েছে। আমদানিকারক মোহাম্মদ আলী জুবায়ের খানের দাবি, ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি কেজি কাঁচা খেজুর আমদানিতে প্রায় ১৩ টাকা শুল্ক দিতে হতো, যা বেড়ে এখন প্রতি কেজিতে ৬৩ থেকে ৬৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। শুল্কের সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ বাবদ খরচ, স্থলবন্দর ব্যয়, গাড়িভাড়া ও আড়তদারি যোগ করলে প্রতি কেজিতে প্রায় ৭০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। জুবায়ের খান বলেন, বাজারে প্রথম দিকে দাম বেশি থাকলে কিছু লাভ হয়, কিন্তু বেশি আমদানির কারণে দাম পড়ে গেলে অনেক সময় শুল্ক ও পরিবহন ব্যয়ই ওঠে না। আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, শুল্ক কমানো হলে কাঁচা খেজুরসহ অন্যান্য আমদানি করা ফল আরও কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইয়াহিয়া খান বলেন, চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন কয়েক ট্রাক কাঁচা খেজুর কক্সবাজারে আসছে, যা থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা ২০ থেকে ৭০ কেজি করে কিনে শহর ও উপজেলা সদরে নিয়ে যাচ্ছেন। বাজারে আম, আপেল, কমলা, আনার ও নাশপাতির পাশাপাশি কাঁচা খেজুর নতুন এবং সাশ্রয়ী হওয়ায় ক্রেতারা বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সরবরাহ আরও বাড়লে প্রতি কেজিতে দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমতে পারে বলেও তাঁর ধারণা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার দে বলেন, বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে কাঁচা খেজুরের উৎপাদন খুবই সীমিত, তাই বাজারে বিক্রি হওয়া বেশির ভাগ কাঁচা খেজুর আমদানি করা।
পুষ্টিবিদদের মতে, খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করা, খাদ্য আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও বিভিন্ন অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে। কাঁচা অবস্থায় খাওয়া খেজুরেও এসব পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে ফলটি মিষ্টি হওয়ায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিমাণ বিবেচনা করে খেতে হবে। ব্যবসায়ীরা জানান, ফলের বাজারে এখন আম, আপেল, মাল্টা, কমলা, নাশপাতি ও আনার থাকলেও কাঁচা খেজুর আলাদা ধরনের পণ্য হিসেবে নজর কাড়ছে। স্বল্প সময়ের জন্য পাওয়া যায় বলেও অনেকে এখনই কিনছেন।




