দেশের সরকারি হিসাব-নিকাশের প্রচলিত কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে ১ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৩০ জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরকে বদলে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ সময়সীমায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন মিলেছে। তবে এই নতুন ব্যবস্থা এখনই কার্যকর হচ্ছে না; ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত একটি ৯ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন অর্থবছর রাখা হবে, যার পরে ২০২৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে নতুন পদ্ধতিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর গণনা শুরু হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বর্ষাকালে অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং মান খারাপ হওয়াই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। জুলাই-আগস্টে ভারী বৃষ্টির কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ তৈরি হয়। এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করলে বর্ষা শুরুর আগেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সংবিধান, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-সহ বিভিন্ন আইনে সংশোধনী আনার পাশাপাশি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার ও সিস্টেমে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন প্রয়োজন হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বিষয়টি বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

অর্থবছর বলতে সরকারের আয়-ব্যয় হিসাবের ১২ মাসের সময়সীমাকে বোঝানো হয়, যার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ও উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব নির্ধারণ করা হয়। এই অঞ্চলে অর্থবছরের ইতিহাস ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ শাসন শুরুর পর থেকে। ১৮৬০ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের অর্থ সদস্য জেমস উইলসন প্রথম আনুষ্ঠানিক বাজেট উপস্থাপন করেন, তখন অর্থবছর ছিল মে থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ সরকার এই সময়সীমা এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তন করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের হিসাব ব্রিটেনের অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক সরকার জুলাই-জুন অর্থবছর চালু করে, যুক্তি ছিল বর্ষার আগে প্রকল্পের কাজ শেষ করা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ এই পদ্ধতিই বহাল রাখে এবং সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ১ জুলাই থেকে অর্থবছর শুরুর কথা উল্লেখ করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থবছরের কোনো একক নিয়ম নেই। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর অনুসরণ করে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকায় ভারত, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশ এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর মেনে চলে। অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশ জুলাই-জুন, আর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার অক্টোবর-সেপ্টেম্বর সময়সীমা অনুসরণ করে। ইরান ও আফগানিস্তানে ধর্মীয় নববর্ষভিত্তিক অর্থবছর চালু আছে।

সরকারের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষ তিন মাস (এপ্রিল-জুন) বর্ষাকালে পড়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে তাড়াহুড়ো ও অপচয় বাড়ে। অর্থবছর মার্চে শেষ হলে শেষ মুহূর্তের ব্যয়ের চাপ পড়বে শুষ্ক মৌসুমে, ফলে বর্ষার আগেই কাজ শেষ করা যাবে। তবে এ পরিবর্তনের জন্য বাজেট পাসের সময়সূচিও বদলাতে হবে। এখন জুনে বাজেট পাস হয়ে ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়; নতুন ব্যবস্থায় মার্চের মধ্যেই সংসদে বাজেট পাস করতে হবে, ফলে বাজেট প্রণয়নের কাজ সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শুরু করতে হবে। সরকারি অর্থবছরের সঙ্গে করবর্ষ বদলানো হবে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। আইএমএফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করবর্ষ পরিবর্তন করলে কোম্পানিগুলোর হিসাব, নিরীক্ষা ও সফটওয়্যারের সময়সূচি বদলাতে হবে, যা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক দেশে তাই শুধু সরকারি অর্থবছর পরিবর্তন করে করবর্ষ অপরিবর্তিত রাখা হয়।

অর্থবছরের শেষে ব্যয় বাড়ার প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদ জেফ্রি লাইবম্যান ও নিল মাহোনি দেখেছেন, ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের মোট চুক্তিভিত্তিক ক্রয়ের ১৬.৫ শতাংশ হয়েছে অর্থবছরের শেষ মাসে। এর কারণ হলো 'ইউজ ইট অর লুজ ইট' নীতি, যেখানে দপ্তরগুলো বছরের শেষে অব্যবহৃত অর্থ হারানোর ভয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেও টাকা খরচ করে। গবেষকদের মতে, অব্যবহৃত বরাদ্দ পরের বছরে নেওয়ার সুযোগ ('বাজেট রোলওভার') দিলে এই সমস্যা কমতে পারে। অর্থাৎ অর্থবছর কোন মাসে শেষ হচ্ছে তার চেয়ে বড় বিষয় হলো অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের নিয়ম।

ভারতে ২০১৬ সালে অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কর আচার্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। কৃষি ও বর্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য, কর আদায় এবং ব্যবসার খরচ বিবেচনা করে কমিটি পরামর্শ দিলেও শেষ পর্যন্ত ভারত এপ্রিল-মার্চ ব্যবস্থাই বহাল রাখে। বাংলাদেশের জন্য ভারতের শিক্ষা হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করেছিল, অথচ বাংলাদেশ আগেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে এখন বাস্তবায়নের কৌশল ঠিক করতে কমিটি গঠন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৬ সালে অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে অক্টোবর-সেপ্টেম্বরে পরিবর্তন করে, কিন্তু এর পরও নিয়মিত বাজেট পাসে ব্যর্থ হয়ে সরকারকে বারবার অস্থায়ী বরাদ্দের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নিউজিল্যান্ড ১৯৮৯ সালে অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ থেকে জুলাই-জুনে বদলায়, তবে সেটি ছিল বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অংশ। মিয়ানমারে অল্প সময়ের মধ্যে দুবার অর্থবছর বদলানোর ফলে হিসাব তুলনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং স্বচ্ছতা কমেছে।

নতুন অর্থবছর ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়নকাজ শেষ করার সুযোগ, বর্ষার খোঁড়াখুঁড়ি ও জনদুর্ভোগ কমানো, এবং ভারত, জাপানের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয়। তবে বড় ঝুঁকিও রয়েছে। জুনের তাড়াহুড়া মার্চে চলে যেতে পারে, নতুন অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস বর্ষাকালে পড়ায় প্রকল্পের প্রস্তুতি সময়মতো শেষ না হলে সুবিধা পাওয়া যাবে না। ৯ মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছরের হিসাব অন্যান্য বছরের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন হবে। অর্থবছর পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছ হয় তার ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা না বাড়ালে এই পরিবর্তন কেবল জুনের তাড়াহুড়াকে মার্চে সরিয়ে দেবে, সমস্যার সমাধান করবে না।