শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ একসময় দেশের নিত্যপণ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, খালঘাট, দাদার ঘাট, কেরোসিন ঘাট ও বটতলা ঘাটে এখনো সকাল থেকে পণ্য ওঠা-নামানোর কাজ চলছে; চট্টগ্রাম থেকে আসা জাহাজ থেকে গম নামানো হচ্ছে এবং শ্রমিকেরা ট্রলারে বস্তা তুলছেন। তবু আগের মতো ব্যস্ততা বা ভিড় নেই।
এই মোকাম দেশের আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, লবণ, চিনি ও গোখাদ্যের পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যের কেন্দ্র। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা জানান, এক দশক আগে প্রতিদিন গড়ে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হতো; এখন তা প্রায় ৫০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। শুধু লেনদেন নয়, পাইকারি ক্রেতার আনাগোনাও কমেছে। ভাই ভাই ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক পরিতোষ সাহা বলেন, আগে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০ থেকে ৪০ জন পাইকারি ক্রেতা আসতেন; বর্তমানে সেই সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জনে সীমিত।
ব্যবসায়ীদের মতে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রসার ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণেই নিতাইগঞ্জের গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করে প্যাকেটজাত পণ্য উৎপাদনের পর নিজস্ব ব্যবস্থায় সরাসরি দোকানে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এতে পুঁজির সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আটা ও ময়দার ব্যবসায় এই সংকট স্পষ্ট। জেলার মিল মালিক সমিতির তথ্য অনুসারে, বি কে রোড ও কাচারি গলির এক কিলোমিটারের মধ্যে ৭২টি মিল রয়েছে; এর মধ্যে ১২টি বর্তমানে বন্ধ। চালু মিলগুলোতে এখন প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন, যা আগের তুলনায় কম। স্থানীয়দের মতে, ষাটের দশকে এখানে গম থেকে আটা উৎপাদন শুরু হয়; ১৯৬৫ সালের দিকে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয় এবং ২০০০ সালের পর স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার শুরু হয়। একসময় প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টন আটা-ময়দা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো; এখন তা কমে ১০০ থেকে ১৫০ টনে দাঁড়িয়েছে। মীম শরৎ গ্রুপের আটটি ফ্লাওয়ার মিলের মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ আলম জানান, পাঁচ বছর আগেও নিতাইগঞ্জে ভালো ব্যবসা ছিল, কিন্তু বড় কোম্পানির প্যাকেটজাত পণ্যের কারণে বাজার অনেকাংশে সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার মিল মালিক সমিতির সভাপতি সোহাগ হোসেন সতর্ক করে বলেন, সরকারের সহায়ক নীতি না পেলে আরও মিল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
লবণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় নিতাইগঞ্জে লবণের ৪২টি মিল ছিল; এখন চালু আছে মাত্র ৭টি। আগে চট্টগ্রাম থেকে ক্রুড লবণ এনে এখানে ক্রাশিং করা হতো। কিন্তু চট্টগ্রামের মিলগুলো সরাসরি মাঠ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করায় উৎপাদন খরচ কম পড়ছে। নারায়ণগঞ্জ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক শ্যামল সাহা ব্যাখ্যা করেন, উৎপাদিত লবণের ৮০ শতাংশ বিভিন্ন ডায়িং কারখানায় এবং বাকি ২০ শতাংশ রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। জেলা লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাউসার আহমেদ যোগ করেন, প্রক্রিয়াজাতের পর প্রতি মণে ৫ থেকে ১০ কেজি লবণ কম পাওয়ার সমস্যাও রয়েছে। গরিবে নেওয়াজ মিলের মালিক জামাল উদ্দিন দেওয়ান জানান, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা নিয়মিত উৎপাদন করতে পারছেন না। এই কারণে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
ডালের বাজারেও পতন দেখা দিয়েছে। বি কে দাস রোডে একসময় ডালের ৩৫টি মিল ছিল; বর্তমানে আছে ১২টি, যার মধ্যে ৬টি চালু ও ৬টি বন্ধ। নিতাইগঞ্জ ডাল মিল মালিক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি বিকাশ সাহা বলেন, আগে দেশের ডালের বড় অংশ এখানকার মিলগুলো থেকে সরবরাহ হতো; এখন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার চলে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলগুলো টিকতে পারছে না। চালু মিলগুলোও একদিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু করপোরেট প্রতিযোগিতাই নয়, অবকাঠামোগত সমস্যাও বড় বাধা। যানজটের কারণে নিতাইগঞ্জে মালবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে পারে না। দূরে ট্রাক রেখে সেখান থেকে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হয়, ফলে সময় ও ব্যয় দুটোই বেশি লাগে। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে আশপাশে একটি নির্ধারিত ট্রাকস্ট্যান্ড তৈরির দাবি জানিয়ে আসছেন। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, শ্রমিক খরচ, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ছে।
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিতাইগঞ্জ এখনো পুরোপুরি গুরুত্ব হারায়নি। দেশের নিত্যপণ্যের বড় একটি অংশের সরবরাহ এই অঞ্চল থেকেই হচ্ছে। আগে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ভৈরব, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ প্রায় ৪০টি জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন; এখন সেই বাজার অনেকটাই ছোট হয়ে ১০-১২টি জেলায় সীমাবদ্ধ। স্থানীয় জয়কালী ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী কৃষ্ণ সাহা বলেন, আগে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হতো; এখন দুপুরের পর নিতাইগঞ্জ অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। সরেজমিনে কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরের সলিমগঞ্জ বাজার থেকে পণ্য নিতে আসা ট্রলারের মাঝি মাঈনউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাইকারেরা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছেন; প্রতি বস্তা মালের জন্য তিনি পাবেন ৩০ টাকা। আগে সপ্তাহে দুবার মালামাল নিতে আসতেন, এখন আসেন একবার।
পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর সাহা মনে করেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই মোকামের আগের জৌলুশ নেই। করপোরেটদের প্রভাব ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় নিতাইগঞ্জ ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা ও সরকারের নীতি সহায়তা অপরিহার্য। তাহলেই কেবল নিতাইগঞ্জ তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।




