দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে। জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনযাত্রায়। নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ওভারটাইমের সুযোগও কমে যাওয়ায় বেশিরভাগ শ্রমিকের মাসিক বেতন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া শ্রমিকদের অবস্থা আরও সঙ্কটজনক হয়ে উঠেছে, কারণ কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাদের আগের মতো পারিশ্রমিক মিলছে না। শনিবার (২২ আগস্ট) নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পকারখানা এলাকা ঘুরে শ্রমিক, কারখানা মালিক এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।
নরসিংদী শহরের শিল্পাঞ্চলখ্যাত চৌয়ালা এলাকায় গ্যাসনির্ভর অন্তত ৩০টি সাইজিং ও ডাইং কারখানা রয়েছে, যেখানে সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণসহ উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হয়। এই এলাকায় প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান রয়েছে বলে জানা গেছে। জেলায় মোট তিন শতাধিক শিল্পকারখানা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ইতিমধ্যে এলাকার অন্তত ২৫টি কারখানায় শ্রমিকদের অবিরত ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মোমিন সাইজিং মিল সাত দিন ধরে বন্ধ ছিল। কারখানার শ্রমিক আবদুস সালাম জানান, সাত দিনের ছুটি শেষে কাজে ফিরে তিনি আবারও আরও তিন দিনের ছুটির ঘোষণা শুনেছেন। গত মাসের বেতনও তিনি এখনও পাননি। সংসার কীভাবে চলবে তা নিয়ে তিনি গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এবং আগামীকাল গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাব্বি সাইজিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইলিয়াস মিয়া ব্যাখ্যা করেন, স্পিনিং, সাইজিং, টেক্সটাইল, ডাইং ও ক্যালেন্ডারিং কারখানাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি কারখানা বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়ে অন্যগুলোতে। বর্তমানে গ্যাস-সংকটের কারণে স্পিনিং, সাইজিং ও ডাইং কারখানাগুলো প্রায় উৎপাদনশূন্য হয়ে পড়ায় টেক্সটাইল কারখানাগুলোও মারাত্মক বিপাকে পড়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে টেক্সটাইল কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশেদুল হাসান জানান, ছুটি দেওয়া কারখানাগুলোর যন্ত্রপাতি অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আবার ফিরে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও মালিকপক্ষের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। তিনি সরকারের কাছে নরসিংদীর শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রতি বিশেষ বিবেচনা দেখানোর অনুরোধ জানান।
নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীতেও একই চিত্র দেখা গেছে। এএমএস গার্মেন্টসের মেশিন অপারেটর লিটন আহমেদ গত মাসে ৩০ ঘণ্টা ওভারটাইম করলেও চলতি মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে এক ঘণ্টাও অতিরিক্ত কাজ করতে পারেননি। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি জানান। একই শিল্পনগরীর অলস্টার গার্মেন্টসের হেলপার নিরব মিয়ার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। গত মাসে তার ১৮ ঘণ্টা ওভারটাইম হয়েছিল, কিন্তু এ মাসে বিকেলেই কারখানা ছুটি হয়ে যাওয়ায় কোনো ওভারটাইমের সুযোগ নেই। তামাই নিট গার্মেন্টসের লকম্যান রাশেদুল হাসান জানান, গত মাসে ওভারটাইমসহ তার বেতন ছিল প্রায় ২২ হাজার টাকা। এ মাসে ওভারটাইম না থাকায় তা ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকায় নেমে আসবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন, যা সংসার ও পরিবারে টাকা পাঠানোয় চাপ সৃষ্টি করবে।
পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর ফোর ডিজাইন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান জানান, ডাইং কারখানা থেকে কাপড় না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ শ্রমিক কর্মরত এই কারখানার ২৫ শতাংশ শ্রমিক উৎপাদনভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাদের কাজের সুযোগ ও আয় দুটোই কমেছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন জানান, উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকরা আট ঘণ্টার বেশি কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না, ফলে ওভারটাইমও হচ্ছে না। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের আয় সবচেয়ে বেশি কমেছে।
গাজীপুরের মৌচাক এলাকার সাদমা ফ্যাশনিজ লিমিটেডের পরিচালক সোহেল রানা জানান, গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানার ডাইং সেকশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে কাজ করা হয়, অন্যথায় শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হয়। ভোগড়া এলাকার প্যানাসিয়া ক্লোদিং লিমিটেডের শ্রমিক আতাউর রহমান স্ত্রী ও পাঁচ বছরের সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। আগে নিয়মিত ওভারটাইম করে সংসারের খরচ চালালেও এখন সেই সুযোগ না থাকায় কাজ আরও কমে গেলে চাকরি থাকবে কি না, তা নিয়েই তিনি শঙ্কিত। অনন্ত লিমিটেডের শ্রমিক রুমানা আক্তার জানান, তার স্বামী অটোরিকশা চালান এবং পরিবারে শ্বশুর-শাশুড়িসহ ছয়জন সদস্য। সংসার চালাতে তার আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়, কিন্তু ওভারটাইম কমে যাওয়ায় আগের মতো অতিরিক্ত টাকা এখন পান না তিনি। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, গ্যাস-সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন আরও কমে যাবে। এতে শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। তাই পোশাকশিল্পকে বাঁচাতে সরকারের দ্রুত গ্যাস সংকট সমাধানের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।



