দেশের ব্যাংক খাতের জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখন সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন আইনিভাবে নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে যেসব বাধা আসে, তাকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে শাসন সংস্কারের উদ্যোগ নিতে গেলেই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল ভূমিকা এবং যাচাই-বাছাই না করে সুবিধাজনক ঋণ বিতরণের সংস্কৃতির কারণে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাত রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রভাবশালী ও রাজনীতিঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো নানা জটিলতায় জর্জরিত। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ক্ষয় হয়েছে এবং মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই ধাক্কার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর।
রাজনৈতিক বিবেচনা বা প্রভাবে ঋণ দেওয়া, নিয়োগ, খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন এবং ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার মতো ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে আসছে। সর্বশেষ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নামে-বেনামে ঋণের নামে লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি ছিল ব্যাংক খাত। সমস্যাগ্রস্ত বিভিন্ন ব্যাংকে জমানো টাকা তুলতে এখনো আমানতকারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ২০৩১ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এজন্য তিন ধাপে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতি প্রশমন করা হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতি বা ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন করা হবে। আর চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে এ খাতের কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করা হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, ব্যাংক খাতে সংস্কার করে পুনর্গঠন করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে ব্যাংক খাত ঠিক করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি যারা ব্যাংক খাতকে এই অবস্থায় নিয়ে গেছে, তাদের বিচার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অনিয়মে যুক্ত না হয়। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি ঠিক করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো জরুরি। পেশাদারত্বের ভিত্তিতে ব্যাংক খাত পরিচালনার সুযোগ দিলে ব্যাংকগুলো আবার অর্থায়ন শুরু করবে। তাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে; যা এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।
প্রথম বছরের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক চিহ্নিত করে আমানতকারী ও সম্পদের সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া। অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে এবং সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে কঠোর তদারকিতে রাখা হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নতুন খেলাপি ঋণ যেন তৈরি না হয়, সেজন্য ঋণখেলাপি ও নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হবে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ নীতি চালু এবং অনিয়মে জড়ানো পর্ষদ পুনর্গঠনের কথাও বলা হয়েছে। আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর করার পাশাপাশি একীভূত ব্যাংকগুলোর মূলধন শক্তিশালী করা এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে আমানত ফেরতের তাৎক্ষণিক পথনকশা তৈরি করা হবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর পুনর্গঠন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বছর হিসেবে নির্ধারিত। এ সময়ে আর্থিক খাতের ভিত্তি মজবুত করা এবং ঋণ আদায় তদারকি জোরদার করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ করার পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির অংশ হিসেবে কঠোর ‘স্ট্রেস টেস্টিং’ চালু হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে। পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং একই পরিবারের পরিচালকের সংখ্যা ও মেয়াদের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। চূড়ান্ত ধাপে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার করা হবে। শেষ দুই বছরে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে আইনি ও প্রবিধানগত পরিবর্তন আনা হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে তথ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি অটোমেটেড করা হবে।
জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি ও প্রবিধানসংক্রান্ত সংস্কারগুলো সরাসরি পরিচালনা করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি সংশোধনের কাজ সমন্বয় করবে। প্রস্তাবিত সংস্কারের অগ্রগতি মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য, সম্পদের গুণগত মান এবং আমানতকারীদের আস্থার সূচক দিয়ে পরিমাপ করা হবে। প্রতি বছর অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ২০২৮ অর্থবছরে একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন (মিড-টার্ম রিভিউ) পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে। কৌশলগত নীতিমালায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু ঋণ বাড়িয়ে বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে রাইট-অফ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে আগে ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে হবে। খেলাপি ঋণ কমলে ব্যাংকগুলো এসএমই, কৃষি ও শিল্প খাতের মতো উৎপাদনশীল খাতে নিরাপদে ঋণ দিতে পারবে।




