ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এ জে আরবেরির সংক্ষিপ্ত সংস্করণ থেকে সুফি সাধক ইব্রাহিম আল-খাওয়াসের জীবনকথা সম্প্রতি বাংলায় অনুবাদ করেছেন রাব্বী আহমেদ। মূল গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় রচিত এবং এটি সুফি জীবনী সাহিত্যের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। ‘মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস’ নামে আরবেরির এই সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। বর্তমান অনুবাদটি ২০০০ সালে আইওয়ার এইমসভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা ওমফালোস্কেপসিস থেকে প্রকাশিত সংস্করণ অনুসরণে তৈরি।
সামাররার আবু ইসহাক ইব্রাহিম ইবনে আহমাদ আল-খাওয়াস ছিলেন বিখ্যাত সুফি জুনায়েদ বাগদাদীর সহচর। ২৯১ হিজরি মোতাবেক ৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে রাই শহরে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ মরুভূমি যাত্রার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন এবং ‘আল্লাহর ওপর পরম নির্ভরশীলদের নেতা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তার আস্থা এতটাই প্রবল ছিল যে, তিনি একটি আপেলের সুবাস অনুসরণ করে মরুভূমি পার হয়ে যেতেন। তবে এই অসাধারণ আত্মবিশ্বাসের পরও তার কাছে সবসময় একটি সুই, একগাছি সুতা, পানির পাত্র এবং একজোড়া কাঁচি থাকত। কেউ এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, ‘এতটুকু জিনিস সঙ্গে রাখলে আল্লাহ-নির্ভরতার কোনো ব্যাঘাত ঘটে না।’
তার ভ্রমণকাহিনিতে উঠে এসেছে একের পর এক বিস্ময়কর ঘটনা। একবার মরুভূমিতে তিনি এক ঘোরগ্রস্ত যুবতীকে দেখতে পান, যার মাথা ছিল অনাবৃত। তাকে মাথা ঢাকতে বললে সে পাল্টা জবাব দেয়, ‘খাওয়াস, তোমার চোখ বন্ধ করো!’ প্রেমে পড়ার কথা জানালে যুবতী বলে, ‘আমি মত্ত, আর মাতাল তার মাথা ঢাকে না।’ এরপর তাকে সঙ্গ দেওয়ার প্রস্তাব দিলে সে জানায়, ‘আমি সেই ধরনের নই যে একজন পুরুষ খুঁজছে।’
আরেক ঘটনায় তিনি মরুভূমিতে খিজিরকে উড়ন্ত পাখির রূপে দেখতে পান। তখন তিনি মাথা নিচু করে ফেলেন, পাছে তার আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। খিজির কাছে এসে বলেন, ‘যদি তুমি আমার দিকে তাকাতে, তবে আমি তোমার ওপর অবতীর্ণ হতাম না।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমি তাঁকে সালাম দিইনি, পাছে আমার আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়।’
একদিন মরুভূমিতে গাছের নিচে পানির কাছে তিনি এক প্রকাণ্ড সিংহকে দেখতে পান। সিংহটি ল্যাংড়ানো অবস্থায় তার সামনে এসে শুয়ে পড়ে এবং গোঙাতে থাকে। থাবাটি ফোলা ও পচনধরা দেখে তিনি একটি কাঠি দিয়ে তা চিরে দেন, পুঁজ বের করে দেন এবং ন্যাকড়া দিয়ে বেঁধে দেন। কিছুক্ষণ পর সিংহটি তার বাচ্চা নিয়ে ফিরে আসে এবং একটি গোল রুটি এনে তার সামনে রাখে।
পথ হারিয়ে ফেলার ঘটনাও বর্ণনা করেছেন তিনি। বেশ কয়েক দিন পথ না পেয়ে হঠাৎ এক মোরগের ডাক শুনে তিনি আনন্দিত হন। সেখানে এক ব্যক্তি তাকে আঘাত করে। ব্যথায় তিনি চিৎকার করে ওঠেন, ‘হে আল্লাহ, যে আপনার ওপর ভরসা রাখে, তার সঙ্গে তারা এমনই আচরণ করে!’ তখন তিনি একটি অদৃশ্য কণ্ঠ শুনতে পান, ‘যতক্ষণ তুমি আমার ওপর ভরসা রেখেছিলে, ততক্ষণ তুমি আমার দৃষ্টিতে মূল্যবান ছিলে। এখন যেহেতু তুমি মোরগের ডাকের ওপর ভরসা রেখেছ, কাজেই তোমাকে প্রহার করা হয়েছে।’ এরপর তিনি দেখতে পান, আঘাতকারী লোকটির কাটা মাথা তার সামনে পড়ে আছে।
রসদ ও বাহন ছাড়া মরুভূমি পার হওয়ার মানত নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। পথে এক খ্রিষ্টান যুবক তার সঙ্গী হওয়ার অনুমতি চায়। এক সপ্তাহ একসঙ্গে চলার পর অষ্টম দিনে যুবকটি ক্ষুধার কথা জানালে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। সঙ্গে সঙ্গে রুটি, ভাজা মাছ ও খেজুরভর্তি পাত্র এবং এক জগ পানি হাজির হয়। এরপর আরও এক সপ্তাহ চলার পর যুবকটির ক্ষমতা দেখতে চান তিনি। যুবকটি ঠোঁট নাড়লে হালুয়া, মাছ ও খেজুরে পূর্ণ দুটি টেবিল ও দুই জগ পানি উপস্থিত হয়। বিস্মিত হয়ে তিনি কিছু খেতে পারেননি। যুবকটি তখন তাকে সুসংবাদ দেয়—সে তার কোমরবন্ধনী কেটে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার প্রার্থনার মাধ্যমেই খাবার এসেছে। এরপর তারা একসঙ্গে মক্কায় পৌঁছান, যেখানে যুবকটি অন্তিম সময় পর্যন্ত অবস্থান করেন।
সিরিয়ায় ভ্রমণের সময় তিনি টক ডালিম না খেয়ে মিষ্টি ফলের আকাঙ্ক্ষা করেন। এরপর এক উপত্যকায় তিনি এক ক্লান্ত ব্যক্তিকে দেখতে পান, যার শরীরে কৃমি ও ভিমরুল হুল ফোটাচ্ছে। তাকে মুক্তির প্রার্থনা করতে চাইলে তিনি জানান, ‘আরোগ্য হলো যা আমি বেছে নিতাম, আর কষ্ট হলো যা তিনি বেছে নেন। আমি তাঁর পছন্দের ওপর নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে নিজের ভেতর থেকে মিষ্টি ডালিম খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাড়িয়ে দাও।’
বাইজান্টিয়ামের এক সন্ন্যাসীর কথা শুনে তার সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি। সন্ন্যাসী জানান, তিনি সত্তর বছর ধরে আশ্রমে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একটি কুকুর পাহারা দিচ্ছেন, যা মানুষের ওপর চড়াও হয়। সন্ন্যাসী তাকে উপদেশ দেন, ‘আর কতকাল মানুষ খুঁজে বেড়াবে? নিজেকে খোঁজো, আর যখন নিজেকে খুঁজে পাবে, তখন নিজের ওপর পাহারায় বসো। কারণ, এই খামখেয়ালি প্রবৃত্তি প্রতিদিন তিন শ ষাট রকমের ঐশ্বরিক ছদ্মবেশ ধারণ করে।’
অনুবাদকের নোটে বলা হয়েছে, ইব্রাহিম আল-খাওয়াসের জীবন ও তার অলৌকিক ঘটনাবলি নিয়ে ঐতিহাসিক ও সুফিদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। সুফি সাহিত্যে তিনি তাওয়াক্কুল—অর্থাৎ আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এই লেখাটিকে কঠোর ঐতিহাসিক মাপকাঠিতে বিচার না করে সুফি সাহিত্যের আধ্যাত্মিক ও নন্দনতাত্ত্বিক পরিসরে পাঠ করা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।




