পরিসংখ্যান সব সময় পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না, আর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের বিষয়টি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমানে মার্কিন জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। আইএমএফ-এর এপ্রিল মাসের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ উপাত্ত অনুযায়ী, এই ঋণ চীনের ১৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। তবে অর্থনীতির আকারের সঙ্গে ঋণের অনুপাত বা ঋণ-টু-জিডিপি রেশিও হিসেব করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ১০টি দেশের তালিকায় খুব একটা উপরের দিকে নেই। আমেরিকার এই অনুপাত প্রায় ১২৬%, যা জাপানের ২০৭% এবং সিঙ্গাপুরের ১৭২% এর তুলনায় অনেক কম। ২০৭% অনুপাতের অর্থ হলো জাপানের জাতীয় সরকারি ঋণ তাদের অর্থনীতির আকারের দ্বিগুণ। অর্থাৎ, দেশটির সমস্ত অর্থনৈতিক আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে চাইলে দুই বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ১২২% অনুপাতটি নির্দেশ করে যে তাদের ঋণ পুরো অর্থনীতির আকারের চেয়েও বেশি।

অ্যাপোলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরস্টেন স্লোকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার করে ঋণ বাড়িয়ে চলেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে অর্থনৈতিক মন্দার মোকাবিলা করার সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। সাধারণত মন্দার সময় সরকার কর হ্রাস বা অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের মাধ্যমে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, কিন্তু বর্তমান ঋণের চাপে যুক্তরাষ্ট্র তা করতে পারবে না, কারণ এতে তারা আরও গভীর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়বে। এছাড়া ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে পারবে না, কারণ এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে এবং নতুন বন্ডের চাহিদায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। স্লোক মনে করেন, এত কম আর্থিক সুরক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে কখনো মন্দার মুখে পড়েনি, ফলে প্রচলিত অর্থনৈতিক কৌশলগুলো এখানে ব্যর্থ হতে পারে।

তবে জাপানের ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সেখানে খুব বেশি আতঙ্ক প্রকাশ করছেন না। এর মূল কারণ হলো জাপানের ঋণের গঠন। জাপানের সরকারি ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ দেশীয় ব্যাংক এবং বীমা তহবিলের কাছে রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বন্ড ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি সেখানে খুব কম। এছাড়া জাপানের পারিবারিক সঞ্চয়ের হার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণ, যা তাদের বিদেশি ঋণদাতার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেয়। জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির মারকাটাস সেন্টারের গবেষক জ্যাক স্যালমন উল্লেখ করেছেন যে, জাপান বিশ্বের বৃহত্তম ঋণদাতা দেশ, আর যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা।

তা সত্ত্বেও জাপানকে আদর্শ উদাহরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বর্তমানে জাপানি ইয়েনের মান কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্ডের মুনাফার হার বাড়ছে। মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় জাপানকে সুদের হার বাড়াতে হচ্ছে, যা তাদের ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঘাটতি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করলেও তা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। স্যালমন মনে করেন, জাপানের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো চিরকাল পরিণামহীনভাবে ঋণ নিতে পারে না।

অন্যদিকে, অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পরিমাপের জন্য ঋণ-টু-জিডিপি অনুপাতটি সঠিক মাপকাঠি নয়। স্ট্যানফোর্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ বিজনেসের অধ্যাপক জোনাথন বার্ক একে একটি বাড়ির মোট ঋণের সাথে বার্ষিক ভাড়ার তুলনা করার মতো বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এই হিসেব রক্ষণাবেক্ষণ বা বীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে এবং এটি নির্দেশ করে না যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার সক্ষমতা আদতে আছে কি না। তাই তিনি একে চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি হিসেবে দেখার বিপক্ষে মত দিয়েছেন।