বিলাসবহুল ঘড়ির বাজার এখন আর কেবল অভিজাত ড্রয়িংরুম বা নির্দিষ্ট শো-রুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এখন নির্ধারণ করছে কোন ঘড়িটি হবে পরবর্তী ট্রেন্ড। এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী এই বাজার এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকের মতো মাধ্যমগুলো ঘড়ি সংগ্রাহক এবং বিক্রেতাদের মধ্যে এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।

আধুনিক পুরুষদের কব্জি ঘড়ির জন্ম হয়েছিল ১৯১১ সালে কার্টিয়ারের 'সান্তোস' মডেলের মাধ্যমে, যা তৈরি করা হয়েছিল একজন বৈমানিক বন্ধু আলবার্তো সান্তোস-ডুমোঁর জন্য। সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার ধরে রেখে কার্টিয়ার আজও জনপ্রিয়, তবে এখন তার প্রচারের ধরন বদলেছে। লন্ডনের মেফেয়ারের মতো অভিজাত এলাকার ঘড়ি বিক্রেতারা এখন তাদের দুর্লভ সংগ্রহগুলো ইনস্টাগ্রামে প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, টম কলিন্সের মতো ডিলাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘড়ির ছবি পোস্ট করার মাত্র ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যেই তাদের সংগ্রহের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বিক্রি করে ফেলছেন।

মিয়ামির হাই-এন্ড ডিলার অ্যাডাম গোল্ডেনের মতে, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্চ করে বিশ্বের প্রায় সব ধরণের উৎপাদিত ঘড়ির খোঁজ পাওয়া সম্ভব। যা একসময় কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে বা সরাসরি দোকানে গিয়ে সম্ভব হতো। এই ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে সেকেন্ডারি বা রিসেল মার্কেটে ব্যাপক উত্থান ঘটেছে। গবেষণা প্ল্যাটফর্ম 'এভরিওয়াচ'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই এই রিসেল মার্কেটের মূল্য ১০.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭.২ শতাংশ বৃদ্ধি।

বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো দীর্ঘকাল ই-কমার্সের প্রতি উদাসীন থাকলেও বর্তমানে তারা এই ট্রেন্ডের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। ২০১৭ সালে ওমেগা ব্র্যান্ডের 'স্পিডি টুয়েসডে' লিমিটেড এডিশন ঘড়িটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যা সরাসরি অনলাইন ভক্তদের চাহিদার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে ব্র্যান্ড এবং সাধারণ ঘড়ি প্রেমীদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে গেছে।

তবে এই ডিজিটাল উন্মাদনার একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। টিকটকের #WatchTok কমিউনিটিতে ঘড়িকে কেবল শখের বস্তু হিসেবে নয়, বরং দ্রুত মুনাফা অর্জনের সম্পদ (Asset) হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে বাজারে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে গত বসন্তে অডেমারস পিগে এবং সোয়াচের যৌথ উদ্যোগে আসা একটি লিমিটেড এডিশন ঘড়ির মুক্তির সময় নিউইয়র্কের একটি শপিং মলে চরম বিশৃঙ্খলা ও দাঙ্গা সৃষ্টি হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার জন্য তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল কেনাকাটার পর ক্রেতারা এক ধরণের শূন্যতা অনুভব করেন, তবুও বিরল ঘড়ি খোঁজার রোমাঞ্চ এবং তা কব্জিতে পরার তৃপ্তি এখনো অপরিবর্তিত। বর্তমান বাজারে প্যাটেক ফিলিপ, রোলেক্স বা আকরিভিয়ার মতো ব্র্যান্ডের দুর্লভ মডেলগুলোর দাম কয়েক হাজার ডলার থেকে শুরু করে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।