বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির চরম প্রভাবে যখন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্ত উত্তপ্ত হচ্ছে, ঠিক তখনই উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে দেখা মিলেছে এক অদ্ভুত বিপরীত পরিস্থিতির। গত দেড়শ বছরে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়লেও গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি নির্দিষ্ট জলরাশি উল্টো প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতল হয়ে গেছে। জলবায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে এই রহস্যময় শীতল এলাকাটি ‘কোল্ড ব্লব’ বা শীতল পিণ্ড নামে পরিচিত। এই অস্বাভাবিক ঘটনার পেছনে থাকা কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এক ভয়াবহ পরিণতির আভাস পাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক গবেষণার ইঙ্গিত অনুযায়ী, এই শীতল বলয়টি আসলে ‘আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন’ (অ্যামক) নামক মহাসাগরীয় স্রোতপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ার একটি বহিঃপ্রকাশ। সাধারণত মেক্সিকো উপসাগর থেকে উষ্ণ ও লবণাক্ত পানি এই স্রোতের মাধ্যমে উত্তর আটলান্টিকের দিকে প্রবাহিত হয়, যা ইউরোপের জলবায়ুকে উষ্ণ ও বাসযোগ্য রাখে। উত্তর মেরুর কাছাকাছি পৌঁছে এই পানি শীতল ও ঘন হয়ে সমুদ্রের তলদেশে নেমে যায় এবং পুনরায় দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। তবে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি সমুদ্রে মিশছে, যা লবণাক্ত পানির ঘনত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পানি আর আগের মতো তলদেশে নামতে পারছে না, যা পুরো সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে মন্থর করে তুলছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই স্রোতব্যবস্থাটি যদি নির্দিষ্ট কোনো সংকটসীমা অতিক্রম করে, তবে ইউরোপজুড়ে চরম শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে এশিয়া ও আফ্রিকার কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য মৌসুমি বায়ু ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। আগে ধারণা করা হতো, আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে এই শীতল বলয় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের বিজ্ঞানী স্টেফান রাহমস্টর্ফ ও তাঁর সহকর্মীদের নতুন গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। স্যাটেলাইট এবং জাহাজের সরাসরি তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন, ১৯৫৫ সাল থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপের ক্ষয় কমলেও সমুদ্রের এক কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত তলদেশ শীতল হচ্ছে। এর স্পষ্ট অর্থ হলো, বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে নয়, বরং গভীর সমুদ্রের স্রোত দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণেই সেখানে উষ্ণ পানি পৌঁছাচ্ছে না।
রাহমস্টর্ফের এই গবেষণায় আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, এই বিপর্যয়ের ফলে কেবল অ্যামক-ই নয়, বরং ‘সাবপোলার জাইর’ নামক এক বিশাল সামুদ্রিক ঘূর্ণিস্রোতও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এই ঘূর্ণিটি বন্ধ হয়ে গেলে ২০৪০-এর দশকের শুরুতেই যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিম ইউরোপের তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও ডেভিড থর্নালি বা নেল ফ্রেজারের মতো অনেক বিজ্ঞানী এই সিদ্ধান্তকে এখনই চূড়ান্ত বলে মানতে নারাজ; তাঁদের মতে, নরওয়েজিয়ান স্রোতের মতো অন্য কোনো শাখা এই তাপের ভারসাম্য রক্ষা করছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে এই সংকটময় মুহূর্তে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের কাটছাঁট বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ওশান অবজারভেটরিজ ইনিশিয়েটিভ’-এর অধীনে গ্রিনল্যান্ড ও আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলে যে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা ছিল, তা বাজেট স্বল্পতায় সংকুচিত করা হচ্ছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশের গভীর পরিবর্তন পরিমাপ করা অসম্ভব, তাই এই ব্যবস্থা বন্ধ হলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাব বুঝতে না পারায় মৎস্যশিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গভীর সমুদ্রের এই নীরব শীতলতা আসলে এক বড় বিপর্যয়ের সংকেত, যা সময়মতো গুরুত্ব না দিলে মানবজাতিকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।




