সমুদ্রের পানির নিয়মিত ওঠানামা—জোয়ার-ভাটা—শুধু কক্সবাজারের সৈকতেই নয়, পৃথিবীর সব সাগর ও মহাসাগরেই ঘটে। দিনে দুবার পানি বেড়ে এসে তীরের বিস্তীর্ণ অংশ ভাসিয়ে দেয়, আবার দুবার নেমে গিয়ে পিছিয়ে যায়। পানি যখন সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছায়, তখন তাকে ভরা জোয়ার বলে; আর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেলে তাকে বলা হয় ভাটা। বড় হ্রদ ও নদীতেও এই ঘটনা লক্ষ করা যায়, তবে সমুদ্রেই এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরের চাঁদই এই বিশাল পানিরাশির গতিপ্রকৃতির মূল নিয়ন্ত্রক। দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও চাঁদের নিজস্ব অভিকর্ষ বল রয়েছে, যা প্রতিদিন সাগরের পানিকে নিজের দিকে টানে। এই টানের ফলেই সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির স্তর ফুলে ওঠে এবং জোয়ারের সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের সবচেয়ে কাছে থাকে, সেখানে পানির এই স্ফীতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—চাঁদের ঠিক বিপরীত দিকে একই সময়ে জোয়ার হয় কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণনের মধ্যে। পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর ক্রমাগত ঘোরে বলে দিন-রাত হয়। এই ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রবিমুখী বলের কারণে চাঁদের বিপরীত পাশের পানিও বাইরের দিকে স্ফীত হয়ে ওঠে। ফলে পৃথিবীর দুই বিপরীত প্রান্তে একসঙ্গে জোয়ার হয়, আর এই দুই জোয়ারের মাঝখানের অঞ্চলে পানি নেমে গিয়ে ভাটার সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে প্রতি ছয় ঘণ্টা পর পর একবার করে জোয়ার বা ভাটা দেখা যায়।

জোয়ার-ভাটার এই চক্রে চাঁদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হলেও একমাত্র তারাই দায়ী নয়। সূর্যেরও একটি শক্তিশালী অভিকর্ষ বল রয়েছে, যা পৃথিবী থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় চাঁদের টানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম প্রভাব ফেলে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তখন সূর্য ও চাঁদের টান একযোগে কাজ করায় সাগরে অস্বাভাবিক উঁচু জোয়ার হয়, যাকে ভরা জোয়ার বলা হয়। অন্যদিকে, চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর সঙ্গে ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে, তখন সূর্যের টান চাঁদের টানকে বাধা দেয়। ফলে পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওঠে, যা মরা জোয়ার নামে পরিচিত।

নদীতে জোয়ার-ভাটার ঘটনা অবশ্য সরাসরি চাঁদের টানে হয় না। সাগরের সঙ্গে নদীর সংযোগ থাকায় সাগরের পানি জোয়ারের সময় নদীতে প্রবেশ করে এবং ভাটার সময় ফিরে যায়। এভাবেই মূলত চাঁদ, সূর্য এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন—এই তিনটি শক্তির সম্মিলিত প্রভাবে সমুদ্রের পানির এই নিয়মিত ওঠানামা ঘটে।