মঙ্গল গ্রহের দুটি ক্ষুদ্র উপগ্রহ ফোবোস ও ডিমোসের রহস্য দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের বিষয়। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ডিমোসের অদ্ভুত আকৃতি এবং এর ভূপ্রকৃতির কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রিক ভাষায় যার অর্থ 'আতঙ্ক', সেই ডিমোস দেখতে অনেকটা ছোট ও এবড়োখেবড়ো আলুর মতো। মঙ্গল থেকে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চাঁদটি ১৯৭০-এর দশক থেকে বিভিন্ন মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার 'হেরা মিশন' এই উপগ্রহটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে নতুন তথ্য সংগ্রহ করেছে।

ডিমোসের গঠন তার সঙ্গী উপগ্রহ ফোবোসের চেয়ে বেশ আলাদা। ফোবোসের পৃষ্ঠে প্রচুর গর্ত বা খাদ থাকলেও ডিমোস তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মসৃণ। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা 'রেগোলিথ' নামক ধুলা ও ক্ষুদ্র পাথরের একটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন, যা পুরো চাঁদটিকে ঢেকে রেখেছে। তবে ডিমোসের দক্ষিণ মেরুতে প্রায় ১০ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি বিশাল গর্ত রয়েছে। এই গর্তের সৃষ্টি এবং পৃষ্ঠের মসৃণতার রহস্য উদঘাটন করতে গবেষকরা সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেছেন। এই মডেলের মাধ্যমে গ্রহাণু বা ধূমকেতুর সংঘর্ষের সময় কোটি কোটি কণার গতিবিধি, মাধ্যাকর্ষণ এবং পাথরের কঠোরতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব।

গবেষক দলটি প্রায় ১০০টি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি সিমুলেট করেছেন, যেখানে গ্রহাণুর আকার, গতি এবং আঘাতের কোণ পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রতিটি মডেলের ফলাফল ২০২৫ সালের হেরা মিশনের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে প্রবল সম্ভাবনা হলো—প্রায় ৩২০ মিটার চওড়া একটি গ্রহাণু ৪৫ ডিগ্রি কোণে ডিমোসে আঘাত করেছিল। এই প্রচণ্ড ধাক্কায় উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে বিশাল গর্ত তৈরি হয় এবং পৃষ্ঠের পাথর ও ধুলা ছিটকে গিয়ে পুনরায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু কিছু স্থানে এই নতুন স্তরের পুরুত্ব ২০০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা ডিমোসকে ফোবোসের চেয়ে মসৃণ করে তুলেছে। গবেষণার সহলেখক মার্টিন ইউটজি জানান, এই একটি আঘাতই বর্তমান ভূদৃশ্য তৈরিতে যথেষ্ট ছিল, যদিও এটি পুরো চাঁদটিকে টুকরো করার মতো শক্তিশালী ছিল না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ধুলার স্তরের নিচে থাকা কিছু প্রাচীন গর্তের চিহ্ন। ডিমোসের অভ্যন্তরীণ গঠন শক্ত পাথরের বদলে ভাঙা পাথরের স্তূপের মতো হওয়ায় আঘাতের শক্তি ভেতরে গিয়ে হ্রাস পেয়েছিল, ফলে পুরনো গর্তগুলো সম্পূর্ণ মুছে যায়নি।

ডিমোসের জন্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত। একদল মনে করেন, কোটি বছর আগে মঙ্গলে কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে ছিটকে আসা উপাদান থেকে এই চাঁদ তৈরি হয়েছে। অন্য দলের মতে, এটি মূলত একটি গ্রহাণু ছিল যা মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণে আটকা পড়েছে। বর্তমান গবেষণা থেকে জানা গেছে, ডিমোসের ভেতরটা অনেকটা ফাঁপা বা ছিদ্রযুক্ত, যা 'রাবল-পাইল' গ্রহাণুর বৈশিষ্ট্যের সাথে মেলে। তবে প্রধান লেখক সাবিনা রাদুকান মনে করেন, এটি মঙ্গল থেকে ছিটকে আসা উপাদানের সমষ্টিও হতে পারে। এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান মিলতে পারে জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার (JAXA) 'মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন' (MMX) মিশনের মাধ্যমে। ২০২৭ সালে মঙ্গলের চাঁদে পৌঁছে এমএমএক্স ফোবোসের মানচিত্র তৈরি করবে এবং ২০৩১ সালে সেখান থেকে নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। এরপর মিশনটি ডিমোস পর্যবেক্ষণ করবে, যা নিশ্চিত করবে এটি কি সত্যিই কোনো গ্রহাণু ছিল নাকি মঙ্গলেরই অংশ।