উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে 'স্মল এআই' বা ক্ষুদ্র আকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের গুরুত্ব তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চগতির ইন্টারনেট বা শক্তিশালী সংযোগের অভাব থাকলেও স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরাসরি ব্যবহার করা যায় এমন মডেল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এই আন্তর্জাতিক সংস্থা। সিলিকন ভ্যালির বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য জটিল ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এআই তৈরি করছে, ঠিক তখনই বিশ্বব্যাংক উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বিশেষায়িত ও সহজলভ্য প্রযুক্তির কথা বলছে।
বিশ্বব্যাংকের চিফ নলেজ অফিসার এবং আয়ারল্যান্ডের সাবেক অর্থমন্ত্রী পাসকল ডনাহিউর মতে, স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী এআই-কে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে উদীয়মান দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, যেসব পরিবর্তন আনতে আগে কয়েক শতাব্দী সময় লাগত, স্মল এআই-এর মাধ্যমে তা মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই সম্ভব হতে পারে। এই বিশেষায়িত মডেলগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা কাজের জন্য ছোট ডেটাসেটের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়, ফলে এগুলো স্থানীয় ভাষায় কাজ করতে পারে এবং দুর্বল নেটওয়ার্কেও কার্যকর থাকে।
একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ডনাহিউ বিশ্বব্যাংকের কৃষি প্রকল্প 'এগ্রিকানেক্ট'-এর কথা বলেন। তিনি জানান, ভারতের ক্ষুদ্র খামারিরা তাদের নিজস্ব ভাষায় মাটির পুষ্টিগুণ ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ জানতে আগ্রহী। যেহেতু প্রতিটি খামারে বিশেষজ্ঞ কৃষি বিজ্ঞানী পাঠানো সম্ভব নয়, তাই কৃষকের স্মার্টফোনে থাকা 'স্মল এআই' সঠিক তথ্যের জোগান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, এই ধরনের কম শক্তিনির্ভর প্রযুক্তি বৈশ্বিক দক্ষিণ ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে এই সেবার সম্প্রসারণের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতার প্রয়োজন।
সম্প্রতি ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনে এআই-এর প্রভাব এবং কর্মসংস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এআই-এর সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে মৌলিক পরিকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। এর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং জনগণের প্রযুক্তি গ্রহণ করার মানসিকতা অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। তিনি মনে করেন, এই প্রাথমিক বাধাগুলো দূর হলে মোবাইল ফোনের মতোই এআই-এর ব্যবহার গণতান্ত্রিক হবে এবং সবার হাতের নাগালে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে, অগাস্টে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট'-এ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাব-সাহারান আফ্রিকার গ্রামীণ এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্কুলে বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি স্কুলে ইন্টারনেটের সুবিধা পৌঁছায়নি। ফলে প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করতে বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।




