প্রযুক্তি জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মার্ক জাকারবার্গ মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের প্রসারে এক বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। সম্প্রতি স্ট্রাইপ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জন কলিসনের পডকাস্ট 'চিকি পিন্ট'-এ কথা বলার সময় তিনি জানান, এআই প্রকল্পটির কার্যকারিতার কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়ার আগেই তিনি এতে ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মেটার প্রধান এআই অফিসার আলেকজান্ডার ওয়াং এই দৃষ্টিভঙ্গিকে 'লিন স্টার্টআপ' মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে প্রমাণ পাওয়ার আগে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাকারবার্গের এই বিশাল বিনিয়োগের পেছনে রয়েছে অ্যাপল এবং গুগলের সাথে দীর্ঘ দুই দশকের রেষারেষি। স্মার্টফোন যুগের শুরুতে ফেসবুক অ্যাপটি আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা মেটার জন্য অনেক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে অ্যাপলের ট্র্যাকিং পলিসিতে পরিবর্তনের ফলে ২০২২ সালেই মেটার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। জাকারবার্গের মতে, অন্যের প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো বা 'ফুল-স্ট্যাক' ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছে। বর্তমানে মেটা নিজস্ব ডেটা সেন্টার, চিপ এবং লো-লেভেল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করছে যাতে কোনো তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
আর্থিক দিক থেকে মেটার এই যাত্রা চ্যালেঞ্জিং, কারণ অ্যামাজন বা মাইক্রোসফটের মতো তাদের কোনো ক্লাউড বিজনেস নেই যা থেকে আয় হয়। জাকারবার্গ জানান, একটি এক-গিগাওয়াট এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং এর বার্ষিক পরিচালন খরচ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। লুইজিয়ানায় তাদের 'হাইপেরিয়ন' ক্যাম্পাসটি পাঁচ গিগাওয়াট পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে মেটা এখন তাদের কম্পিউটিং ক্ষমতা অন্যদের কাছে বিক্রি করার জন্য একটি ক্লাউড ব্যবসার পরিকল্পনা করছে।
মেটার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে 'মিউজ ওয়ান্ডার' এবং আরও শক্তিশালী 'মিউজ ওয়ান্ডার ফুল' মডেল। এর মাধ্যমে তারা 'মিউজ' নামক একটি ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট তৈরি করতে চায়, যা ব্যবহারকারীর হয়ে আইনি, আর্থিক বা চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ দলের মতো কাজ করবে। জাকারবার্গ নিজেই উদাহরণ হিসেবে জানান, তিনি তার তিন বছর বয়সী মেয়ের সাথে উইকএন্ডে বেকিং করার উপকরণ কেনার জন্য 'ইনস্টাকার্ট' অ্যাকাউন্টটি মিউজ এজেন্টের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, যার ফলে তার কেনাকাটার হার বছরে দুবার থেকে বেড়ে সপ্তাহে দুবারে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই 'এজেন্টিক কমার্স' মেটার বর্তমান আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন খাতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এআই এজেন্টরা যদি নিজেই পণ্যের দাম তুলনা করে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে কেনাকাটা করে, তবে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে পারে। এই প্রশ্নের জবাবে জাকারবার্গ বলেন, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন মেটার সাথে গভীরভাবে যুক্ত হতে আগ্রহী। আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে তিনি সাবস্ক্রিপশন মডেলের কথা বলেন, যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য মিউজ বিনামূল্যে হলেও ভারী ব্যবহারকারীদের জন্য মাসিক ২০ থেকে ১০০ ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবহারকারীদের অর্থ সাশ্রয় বা উপার্জনে সহায়তা করে সেখান থেকে সামান্য কমিশন নেওয়ার পরিকল্পনাও তার রয়েছে। বর্তমানে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের মতে, মেটা এআই-এর দৌড়ে আবার আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরে এসেছে, যদিও বিশাল ব্যয় এখনও একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।




