দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে সূচিত হওয়া একটি ছোট মানবিক প্রয়াস। মাসে একদিনের টিফিনের অর্থ সঞ্চয় করে এখন আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার উপকরণ সরবরাহ করছেন। কেবল উপকরণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয় এই উদ্যোগ; মাদক, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি ও কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা ছড়ানোর পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও দুর্যোগকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজও করছেন তাঁরা। ‘লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘ’ নামে এই সংগঠনটি বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কাওসার দাউদকান্দির বিটেশ্বর ইউনিয়নের পশ্চিম নোয়াদ্দা গ্রামের গিয়াস উদ্দিন ও রেখা আক্তার দম্পতির সন্তান। ২০০৫ সালে তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর ছোট বোন ফারজানা আক্তার পড়তেন সপ্তম শ্রেণিতে। মূলত ওই বছরের একটি ঘটনা এই পথচলার সূচনা করে। স্কুল থেকে ফেরার পথে তাঁরা দেখেন, গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের কন্যাশিশুকে তাঁর মা-বাবা মারধর করছেন। শিশুটিকে ঢাকায় পরিচিত একজনের বাসায় কাজে পাঠানোর চেষ্টা চলছিল, কিন্তু মেয়েটি বারবার বলছিল—সে কাজ করতে চায় না, পড়াশোনা করতে চায়। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় শিশুটির পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
এই দৃশ্য কাওসার ও ফারজানার মনে গভীর রেখাপাত করে। বাড়ি ফিরে তাঁরা নিজেদের বৃত্তির টাকা থেকে জমা করা সঞ্চয় একত্রিত করে সেই অর্থ শিশুটির মায়ের হাতে তুলে দেন। ফলস্বরূপ শিশুটি পুনরায় স্কুলে ফিরতে সক্ষম হয়। তার মুখের হাসি দুই ভাইবোনের হৃদয়ে গেঁথে যায়। তবে পরবর্তীতে এসএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর ওই শিশুটির মা-বাবা গোপনে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন এবং পড়াশোনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেন। এই ঘটনা তাঁদের মনে নতুন চিন্তার জন্ম দেয়। এরপর থেকে বৃত্তির টাকা পেলেই নিজেদের জন্য ব্যয় না করে গ্রামের দরিদ্র শিশুদের জন্য খাতা, কলম, পেনসিল, রাবার, জ্যামিতি বক্সসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ কিনে দিতে শুরু করেন। ২০১১ সালের মে মাসে এই ছোট উদ্যোগ সাংগঠনিক রূপ পায় এবং ‘লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো বড় পৃষ্ঠপোষক বা বিপুল অর্থের জোগান ছিল না। ছিল কেবল মানুষের কল্যাণে কিছু করার অদম্য ইচ্ছা। ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন। প্রতি মাসে একদিনের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে তাঁরা সংগঠনে ১০ টাকা করে জমা দেন। একেকজনের কাছে এই অর্থ সামান্য মনে হলেও হাজারো শিক্ষার্থীর ছোট সঞ্চয় মিলিত হয়ে তা হয়ে ওঠে বিশাল মানবিক শক্তি। কখনো এই অর্থে কেনা হয় কোনো শিশুর খাতা-কলম, কখনো বই বা স্কুলব্যাগ। ঈদের সময় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দেওয়া হয় নতুন পোশাক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগের সময়ও স্বেচ্ছাসেবকেরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বর্তমানে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। কাওসার আলম সোহেলের নেতৃত্বে কর্মকাণ্ড এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৬৪ জেলায়। কাওসারের কাছে একজন শিক্ষার্থীর হাতে একটি বই তুলে দেওয়া মানে কেবল একটি বই দেওয়া নয়; তার সামনে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তৈরি করা। একটি শিশুকে মাদক থেকে দূরে থাকার কথা বলার পাশাপাশি তাকে সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন দেখানোও তাঁর কাজের অংশ। তাঁর বিশ্বাস, কেবল শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। সমাজের রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা ও চেতনার পরিবর্তন। এই লক্ষ্যেই সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে প্রায় ৪৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে মাদক, স্মার্ট ফোনে আসক্তি, মিথ্যা, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, বাল্যবিবাহ, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, দুর্নীতি ও কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতন করা হয়েছে। সংগঠনটির আয়োজনে মাদক, স্মার্ট ফোনে আসক্তি ও কিশোর অপরাধকে লাল কার্ড প্রদর্শন করে চরিত্র গঠনের শপথ অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতির যত্নেও মনোযোগ দিয়েছেন কাওসার ও তাঁর দল। গত ১৫ বছরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬ লাখ ১৫ হাজারের বেশি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয় এবং দুর্যোগের সময় সদস্যরা ছুটে যান দুর্গত মানুষের কাছে। কাওসারের মতে, তরুণদের তিনি কেবল স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে। তাঁর উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সামর্থ্যের সামান্য অংশ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করছেন। দীর্ঘ পথচলার পরও তাঁর লক্ষ্য অপরিবর্তিত—একজন শিশুর হাতে শিক্ষা উপকরণ তুলে দেওয়া, একজন শিক্ষার্থীকে সচেতন করা, একটি গাছের চারা রোপণ করা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
সম্প্রতি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার খোর্দ্দকোমরপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর ১ হাজার ৯৪১তম কর্মসূচি। দাউদকান্দির বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান তালুকদার এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য কাওসার আলম সোহেলের কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ছোট ছোট সঞ্চয় দিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পাচ্ছেন।




